বাংলা সাহিত্যে চৈতন্যদেবের প্রভাব | বাঙালির সমাজজীবনে চৈতন্যদেবের আবির্ভাবের গুরুত্ব | শ্রীচৈতন্যদেবের জীবনকাহিনি

বাংলা সাহিত্যে চৈতন্যদেবের প্রভাব আলােচনা করাে।


'শিক্ষাষ্টক' ছাড়া শ্রীচৈতন্যদেব (১৪৮৬-১৫৩৩) নিজে আর কোনাে গ্রন্থ রচনা না করলেও চৈতন্য-পরবর্তী বাংলা সাহিত্যে তাঁর প্রত্যক্ষ ও পরােক্ষ প্রভাব প্রচুর পরিমাণে লক্ষ করা যায়। যেমন-


  • চৈতন্যের আগে বৈষ্ণব সাহিত্যে কৃষ্ণের ঐশ্বর্যভাবের প্রাধান্য থাকলেও চৈতন্যদেবের মৃত্যুর পরে মূলত কৃষ্ণের মাধুর্যভাব নিয়েই পদরচনা শুরু হয়।


  • চৈতন্যদেবের প্রভাবেই বাংলা সাহিত্যে রচিত হয় 'গৌরাঙ্গ বিষয়ক পদ' এবং 'গৌরচন্দ্রিকা' বিষয়ক নানা পদ।


  • মহাপ্রভুর দিব্যজীবনকে কেন্দ্র করে এরপর শুরু হয় চরিতসাহিত্য রচনার জোয়ার। এই জীবনীসাহিত্যের মধ্যে উল্লেখযােগ্য হল লােচনদাসের। চৈতন্যমঙ্গল', বৃন্দাবনদাসের চৈতন্যভাগবত', কৃষ্ণদাস কবিরাজের চৈতন্যচরিতামৃত প্রভৃতি।


  • ভারতীয় রসতত্ত্বের সঙ্গে চৈতন্যপ্রভাবে ভক্তিরসতত্ত্ব নামে এক নতুন তত্ত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়। এইরকম রসতত্ত্বজাতীয় দুটি গ্রন্থ হল, ভক্তিরসামৃতসিন্ধু, উজ্জ্বলনীলমণি।


  • চৈতন্যদেবের প্রভাবে অনেক ইসলামি কবিও রাধাকৃষ্ণের প্রেমলীলা নিয়ে পদ রচনা করেছেন।


  • চৈতন্য-পরবর্তী সময়ে রচিত অনুবাদ কাব্য, মঙ্গলকাব্য, লােকসাহিত্যের মধ্যেও চৈতন্যদেবের বিশেষ প্রভাব লক্ষ করা যায়। কাশীদাসী মহাভারতের পরতে পরতে বৈষ্ণবীয় রুচি ও কোমলতার ছোঁয়া অনুভব করা যায়। অষ্টাদশ উনবিংশ শতাব্দীর শাক্তপদাবলি ও বাউলগানের মধ্যেও যে ভক্তিরসের ধারা প্রবাহিত হয়েছিল, তার উৎসেও চৈতন্য প্রভাবের প্রতিফলন দেখা যায়। চৈতন্য-পরবর্তীকালের মঙ্গলকাব্যের বন্দনা অংশে স্থান পায় 'চৈতন্যবন্দনা'।



বাঙালির সমাজজীবনে চৈতন্যদেবের আবির্ভাবের গুরুত্ব আলােচনা করাে।


চৈতন্যদেবের আবির্ভাবে বাংলার সমাজ ও সংস্কৃতিতে যেসব যুগান্তকারী পরিবর্তন দেখা দিয়েছিল, সেগুলি হল-


  • সমস্ত সংকীর্ণতার ওপরে উঠে যেভাবে শ্রীচৈতন্য অস্পৃশ্যতা বর্জনের আহ্বান জানিয়ে মানুষে মানুষে সমভাবের কথা বলেছিলেন, সেকালের পক্ষে তা ছিল রীতিমতাে বৈপ্লবিক।


  • শ্রীচৈতন্যদেবের প্রভাবে জনরুচির সামগ্রিক পরিবর্তন ঘটেছিল। স্থূল গ্রাম্যতার পরিবর্তে পরিচ্ছন্ন মার্জিত রুচিবােধের জাগরণ ঘটেছিল জনমানসে।


  • সেই সময়কার নীতিভ্রষ্ট সমাজে তার প্রভাব নৈতিক মানােন্নয়নের সহায়ক হয়েছিল।


  • ভিন্ন ধর্ম বা ধর্মসম্প্রদায় সম্পর্কে সহিষ্ণুতা গ্রহণের শিক্ষা দিয়েছিলেন শ্রীচৈতন্যদেব। তিনি শিখিয়েছিলেন তরু বা গাছের মতাে বিনয়ী হতে।


  • জন্ম সার্থক করি করাে পর-উপকার সমকালীন সমাজ তার ধর্মসাধনা থেকে অন্যের উপকার করার এই শিক্ষাই পেয়েছিল।


  • শ্রীচৈতন্যের ভারতভ্রমণ তাঁর ভাব বিনিময়ের পথ সুনিশ্চিত করেছিল। এক সুতােয় গেঁথেছিল তুকারাম রামানন্দ- অদ্বৈতাচার্য, উত্তর-দক্ষিণ-পূর্ব-পশ্চিমকে। এভাবেই মধ্যযুগে জাতীয় সংহতির পথ চওড়া করেছিলেন শ্রীচৈতন্যদেব।


হিংসা-দ্বেষ-কলুষতাপূর্ণ বাঙালি সমাজে সর্বশক্তিমান প্রেমকে প্রতিষ্ঠিত করে শ্রীচৈতন্যদেব বাঙালিকে বাঁচতে শিখিয়েছেন। অসাম্য, বিভেদ, অনাচার, মােহ ও কুসংস্কারের বিপরীতে সামাজিক সাম্যকে প্রতিষ্ঠা করে তিনি এক বিশাল সমাজ-বিপ্লব ঘটিয়েছিলেন। সব মিলিয়ে বলা যায়, ধর্মকে কেন্দ্র করে তিনি সেকালের বাঙালি জীবনে নবজাগরণ ঘটিয়েছিলেন, যার ফল হয়েছিল সুদূরপ্রসারী।



শ্রীচৈতন্যদেবের জীবনকাহিনি সংক্ষেপে লেখাে।


১৪৮৬ খ্রিস্টাব্দের ফাল্গুনী দোলপূর্ণিমার সন্ধ্যায় মহাপ্রভু শ্রীচৈতন্যদেব নবদ্বীপে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতার নাম জগন্নাথ মিশ্র, মাতার নাম শচীদেবী। তাঁর নাম ছিল নিমাই। গায়ের রং গৌর বা ফরসা ছিল বলে তাকে গৌরাঙ্গ বা গােরা বলেও ডাকা হত।


ষােলাে-সতেরাে বছর বয়সে লক্ষ্মীদেবীর সঙ্গে নিমাইয়ের বিবাহ হয়। কিছুকাল পরে তিনি পূর্ববঙ্গে ঘুরতে যান এবং ফিরে এসে সাপের কামড়ে লক্ষ্মীদেবীর মৃত্যুর খবর শােনেন। এরপর মায়ের অনুরােধে দ্বিতীয়বার তিনি বিবাহ করেন বিয়ুপ্রিয়াকে। আনুমানিক তেইশ বছর বয়সে পিতার পিণ্ডদান উপলক্ষে তিনি গয়ায় যান। সেখানে ঈশ্বরপুরীর সান্নিধ্যে এসে তার কাছে দীক্ষা গ্রহণ করেন। তখন থেকেই নিমাইয়ের জীবনে বিস্ময়কর পরিবর্তন ঘটে। নবদ্বীপে ফিরে এসে টোল-চতুষ্পাঠী ছেড়ে হরিভক্তদের নিয়ে তিনি কৃয়নাম সংকীর্তনে মেতে ওঠেন। বৈরাগ্য ক্রমশ প্রবল হয়ে উঠলে তিনি কাটোয়ার কেশব ভারতীর কাছে সন্ন্যাসধর্মে দীক্ষা নিয়ে সংসারের মায়া ত্যাগ করেন। এই সময় তার নতুন নাম হয় 'শ্রীকৃষ্ণচৈতন্য'। চৈতন্য এরপর পুরীতে কিছুদিন অবস্থান করে ভারতের বিভিন্ন তীর্থ পর্যটনে যান।


১৫৩৩ খ্রিস্টাব্দে পুরীতে তিনি ইহলােক ত্যাগ করেন। যদিও তাঁর জীবনাবসানের বিষয়টি এখনও রহস্যে ঢাকা।



বৃন্দাবনদাসের চৈতন্যভাগবত গ্রন্থের সাধারণ পরিচয় দিয়ে কাব্যটির ঐতিহাসিক গুরুত্ব লেখাে।


বৃন্দাবনদাস (জন্ম আনুমানিক ১৫১৮ খ্রিস্টাব্দ) রচিত চৈতন্যভাগবত একটি উল্লেখযােগ্য চৈতন্যজীবনী গ্রন্থ। সম্ভবত ১৫৩৮ থেকে ১৫৫০ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে গ্রন্থটি রচিত হয়েছিল। বলা হয় বৃন্দাবনদাস প্রথমে তাঁর এই চৈতন্যজীবনীর নাম দিয়েছিলেন চৈতন্যমঙ্গল', কিন্তু মায়ের নির্দেশে তিনি এই নাম পরিবর্তন করে চৈতন্যভাগবত নামকরণ করেন। বৃন্দাবনদাসের এই কাব্যের মােট তিনটি খণ্ড আদি, মধ্য ও অন্ত্য খণ্ড মিলিয়ে এই গ্রন্থের অধ্যায় সংখ্যা মােট একান্নটি। আদিখণ্ডে চৈতন্যের জন্ম, বাল্যলীলা, বিদ্যাশিক্ষা, প্রথম ও দ্বিতীয় বিবাহ থেকে গয়াগমন ও নবদ্বীপে ফিরে আসা পর্যন্ত কাহিনি বর্ণিত হয়েছে। মধ্যখণ্ডে চৈতন্যের কৃষ্ণপ্রেমে উদ্ভ্রান্ত অবস্থা থেকে সন্ন্যাসগ্রহণ এবং অন্ত্যখণ্ডে গৌড়ধামে গৌরাঙ্গের কৃষ্ণপ্রেমে মাতােয়ারা রূপের বর্ণনা আছে। তবে এই গ্রন্থের অন্ত্যখণ্ডে চৈতন্যদেবের শেষজীবনের কথা বিশদভাবে বর্ণিত হয়নি। তবে চৈতন্যদেবের বাল্য ও কৈশাের যেভাবে এতে বর্ণিত হয়েছে তা অতুলনীয়। বৃন্দাবনদাসের বর্ণনারীতিও চমৎকার। এই গ্রন্থে সমসাময়িক গৌড়ের রাষ্ট্রীয় ও সমাজ জীবনের অনেক পরিচয় পাওয়া যায়।


চৈতন্যের দিব্য মহিমার ভাব ফুটিয়ে তােলা এই গ্রন্থের রচনাকারের প্রধান উদ্দেশ্য হলেও চৈতন্যের মানবরূপটি কিন্তু কখনােই এখানে ঢাকা পড়ে যায়নি—সেদিক থেকেও গ্রন্থটি বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ।


কৃত্তিবাস-এর অনূদিত কাব্যটির জনপ্রিয়তার কারণ আলােচনা করাে।

কৃত্তিবাসের কাব্যে বাঙালি জীবনের যে ছবি প্রকাশ পেয়েছে তার বিবরণ দাও।

'বাংলা মহাভারত'-এর শ্রেষ্ঠ অনুবাদকের কাব্য রচনাকাল উল্লেখ করে সংক্ষেপে তাঁর জীবন সম্পর্কে লেখাে।

কাশীদাসী 'মহাভারত'-এর সংক্ষিপ্ত পরিচয় দাও।


বাংলা সাহিত্যে 'ভাগবত' অনুবাদের ধারা সম্পর্কে সংক্ষেপে আলােচনা করাে।

ভারতচন্দ্রের বিখ্যাত কাব্যগ্রন্থটির নাম ও রচনাকাল উল্লেখ করে সংক্ষেপে কবির জীবনকথা উল্লেখ করাে।

সংক্ষেপে ভারতচন্দ্রের রচনা ও কবিপ্রতিভার পরিচয় দাও

মঙ্গলকাব্যের এরূপ নামকরণের কারণ উল্লেখ করে মঙ্গলকাব্য রচনার সামাজিক কারণ বর্ণনা করাে।


মঙ্গলকাব্যের সাধারণ বৈশিষ্ট্যগুলি সংক্ষেপে আলােচনা করাে।

মনসামঙ্গল কাব্যের কাহিনি সংক্ষেপে লেখাে।

কবি কেতকাদাস ক্ষেমানন্দের জীবন ও কাব্য সম্পর্কে সংক্ষেপে আলােচনা করাে।

মনসামঙ্গল কাব্যের যে-কোনাে দুজন প্রতিনিধি-স্থানীয় কবির কবি-প্রতিভার পরিচয় দাও।


'চণ্ডীমঙ্গল' কাব্যের বণিক খণ্ডের কাহিনিটি সংক্ষেপে লেখাে।

'চণ্ডীমঙ্গল' কাব্যের শ্রেষ্ঠ কবির আত্মকাহিনির সংক্ষিপ্ত পরিচয় দাও।

‘চণ্ডীমঙ্গল' কাব্যের আখেটিক খণ্ডের কাহিনিটি সংক্ষেপে লেখাে।

মুকুন্দরামের কবিপ্রতিভার পরিচয় দাও।


কবি ঘনরাম চক্রবর্তীর জীবন ও কবি-প্রতিভা সম্পর্কে সংক্ষেপে আলােচনা করাে।

ধর্মমঙ্গল কাব্যের কাহিনি সংক্ষেপে বর্ণনা করাে।

বাংলা মঙ্গলকাব্যের ধারায় শিবায়ন কাব্যটির গুরুত্ব আলােচনা করাে।

বিদ্যাপতি বাংলা ভাষায় কিছু লেখেননি, তবু তাকে বাংলা সাহিত্যের অন্তর্ভুক্ত করা হয় কেন?


কবি বিদ্যাপতির জীবন-পরিচয় দাও।

বিদ্যাপতির কবিপ্রতিভার সংক্ষিপ্ত পরিচয় দাও।

গােবিন্দদাসকে 'বিদ্যাপতির ভাবশিষ্য' বলা হয় কেন?

বাংলার বৈষ্ণব পদসাহিত্যে চণ্ডীদাসের অবদান সম্পর্কে আলােচনা করাে।


জ্ঞানদাসকে ‘চণ্ডীদাসের ভাবশিষ্য' বলার যৌক্তিকতা বিচার করাে।

বৈষ্ণব পদাবলির যে-কোনাে একজনের কবিপ্রতিভার পরিচয় দাও।

বৈষ্ণব পদকর্তা গােবিন্দদাসের কবিপ্রতিভার পরিচয় দাও।

প্রাকচৈতন্য এবং চৈতন্য-পরবর্তী যুগের বৈষ্ণব পদাবলির মধ্যে তুলনামূলক আলােচনা করাে।