মার্কসবাদ কাকে বলে? মার্কসবাদের উৎস সম্পর্কে আলােচনা করাে।

মার্কসবাদ: মার্কসবাদ সমগ্র মানব সমাজের ক্রমবিবর্তনের ধারাকে বিজ্ঞানসম্মত দৃষ্টিভঙ্গির মাধ্যমে আলােচনা করেছে। মার্কসবাদ কী? এ প্রসঙ্গে এমিল বার্নস বলেছেন, মার্কসবাদ হল আমাদের এই জগৎ এবং তারই অংশ মানবসমাজ সম্পর্কে সাধারণ তত্ত্ব। কার্ল মার্কস-এর নামানুসারে এর নামকরণ হয় মার্কসবাদ। আবার লেনিনের মতে, মার্কসের দৃষ্টিভঙ্গি ও শিক্ষা সূচি হল মার্কসবাদ ('Marxism is the system of the views and teachings of Marx') মার্কস এবং এঙ্গেলস মানব সমাজের উৎপত্তি, বিকাশ, প্রকৃতি এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে বিজ্ঞানসম্মতভাবে সমাজ পরিবর্তনের যে তত্ত্ব প্রকাশ করেন, তাকেই মার্কসবাদ বলা হয়। বলাবাহুল্য, এঙ্গেলস, লেনিন, স্তালিন ও মাও-জে-দং সকলেই মার্কসবাদকে বিকশিত ও সমৃদ্ধ করেছেন।


মার্কসবাদের উৎস


মার্কসবাদ কোনাে একটিমাত্র উৎস থেকে সৃষ্টি হয়নি। মার্কসবাদের উৎস হিসেবে প্রধানত তিনটি ধারাকে চিহ্নিত করা হয়, কিন্তু এর বাইরেও আরও কয়েকটি চিন্তাধারা এবং ঐতিহাসিক কারণ মার্কসবাদের উদ্ভবে প্রভাব বিস্তার করেছিল। তাই মার্কসবাদের উৎসকে প্রথমে দুটি ভাগে ভাগ করা যায়―


মার্কসবাদের ঐতিহাসিক উৎস


ফরাসি বিপ্লব ও শিল্প বিপ্লবের ফলে ইউরোপের আধুনিক শ্রমিক শ্রেণির আবির্ভাব ঘটে এবং এর পরিণতিতে শ্রমিক আন্দোলনের সূত্রপাত ঘটে। শ্রমিক শ্রেণির আবির্ভাব এবং পুঁজিবাদের বিরুদ্ধে শ্রমজীবী মানুষের আন্দোলন তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা এবং এই ঘটনা মার্কসবাদের অন্যতম উৎস।


মার্কসবাদের তত্ত্বগত উৎস


মার্কসবাদের উৎস হিসেবে যে তত্ত্বগত উৎস রয়েছে, তাকে ৩টি ভাগে ভাগ করা যায়


[1] জার্মান চিরায়ত দর্শন: মার্কসবাদের আত্মপ্রকাশে জার্মান ভাববাদের অবদান অনস্বীকার্য। এ প্রসঙ্গে জার্মান দর্শনকে দু-ভাগে ভাগ করা যায় ভাববাদী দর্শন এবং বস্তুবাদী দর্শন। ভাববাদী দর্শনের প্রবক্তা হলেন কান্ট, হেগেল ও ফুট। অন্যদিকে বস্তুবাদী দর্শনের প্রবক্তা হলেন ফয়েরবাখ। হেগেলের বাদ (Thesis), প্রতিবাদ (Antithesis), সম্বাদ (Synthesis) এবং ফয়েরবাখের কাছ থেকে দ্বন্দ্ব ধারণাটি মার্কস সযত্নে পরিচর্যা করে তাকে বাস্তবায়িত করেছেন। মূলত মার্কস দ্বন্দ্ববাদ এবং বস্তুবাদ সংক্রান্ত ধারণা জার্মান ভাববাদী দার্শনিক হেগেল ও ফয়েরবাখের কাছ থেকে লাভ করেছিলেন। এ প্রসঙ্গে মার্কস জার্মান দার্শনিক ফয়েরবাখের দ্বারা প্রভাবিত হয়েছিলেন এবং তার বস্তুবাদী দৃষ্টিভঙ্গিকে গ্রহণ করে তাকে দ্বান্দ্বিক পদ্ধতিতে প্রয়ােগ করে একটি সুসংহত বৈজ্ঞানিক মতবাদ গড়ে তুলেছিলেন। অতএব কার্ল মার্কস বিভিন্ন উৎস থেকে তথ্যসমূহ সংগ্রহ করলেও তিনি কিন্তু যুক্তিনির্ভর বিজ্ঞানসম্মত দর্শন তত্ত্ব তুলে ধরে রাষ্ট্রচিন্তার জগতে বিপ্লবের নতুন সূচনা করেছিলেন।


[2] ব্রিটিশ অর্থশাস্ত্র: ব্রিটিশের বিখ্যাত ক্ল্যাসিকাল অর্থনীতিবিদ অ্যাডাম স্মিথ এবং ডেভিড রিকার্ডো ধনতান্ত্রিক অর্থনীতির ভিত্তি স্থাপন করেন। অ্যাডাম স্মিথ মূল্যের শ্রম তত্ত্ব (Labour theory of Value) আবিষ্কার করেন এবং রিকার্ডো এই তত্ত্বকে বিকশিত করেন। মার্কস এদের রাষ্ট্রীয় অর্থনৈতিক তত্ত্বের উপর ভিত্তি করে দেখান যে, কোনাে দ্রব্য উৎপাদনে যে পরিমাণ শ্রম ওই দ্রব্যের মধ্যে নিহিত থাকে তার দ্বারা দ্রব্যের বিনিময় মূল্য নির্ধারিত হয়। অ্যাডাম স্মিথ এবং ডেভিড রিকার্ডোর কাছ থেকে এই সূত্র গ্রহণ করে মার্কস তার 'Das Capital' গ্রন্থে দ্রব্যের মূল্য নির্ধারণে সামাজিক শ্রমের ভূমিকাকে তুলে ধরেন। এই বিশ্লেষণের মাধ্যমে মার্কসের বিখ্যাত উদ্বৃত্ত মূল্য তত্ত্ব' (Theory of Surplus Value) আবিষ্কৃত হয়।


[3] ফরাসি সমাজবাদ: মার্কসবাদের তৃতীয় উৎস হল ফরাসি সমাজতান্ত্রিক চিন্তা ভাবনা। বিখ্যাত ফরাসি কাল্পনিক সমাজতন্ত্র দার্শনিক সাঁ সিমো, ফুরিয়ের, রবার্ট ওয়েন মনে করতেন যে, যুক্তির সাহায্যে সামাজিক অন্যায় দূর করে সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব। অর্থাৎ এই তাত্ত্বিক গোষ্টী সংস্কারের মাধ্যমে সমাজ পরিবর্তনের পক্ষ পাতী ছিলেন। কার্ল মার্কস এই কাল্পনিক সমাজতান্ত্রিক ধ্যান ধারণার দ্বারা প্রভাবিত হলেও ঐতিহাসিক বস্তুবাদ ও দ্বন্দ্বমূলক তত্ত্বের মাধ্যমে শ্রেণিসংগ্রামের স্বরূপ উদঘাটন করেন এবং পুঁজিবাদী বিকাশের স্তর বিশ্লেষণ করে তার অনিবার্য পতনের যুক্তিসংগত ব্যাখ্যা প্রদান করেন। বলা যেতে পারে, কাল্পনিক সমাজতন্ত্রীদের এই তত্ত্বকে মার্কস বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্রের তত্ত্বে রূপান্তরিত করতে। তাই কাল্পনিক সমাজতন্ত্রবাদ মার্কসবাদের উৎপত্তি ও বিকাশের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।