মতাদর্শগত আধিপত্য – গ্রামশ্চীর অবদান

মতাদর্শগত আধিপত্য – গ্রামশ্চীর অবদান

মতাদর্শগত আধিপত্য বা আইডিওলজিক্যাল হেগেমনির ধারণা গ্রামশ্চীর অন্যতম তাত্ত্বিক অবদান। রাষ্ট্র, নাগরিক সমাজ সম্পর্কে বিস্তৃত তত্ত্বচর্চার প্রেক্ষিতে তিনি মতাদর্শগত আধিপত্যের ধারণা গড়ে তোলেন। মতাদর্শগত আধিপত্যের মূল বক্তব্য হচ্ছে এই যে নিম্নবর্গের মানুষজনের ওপর শাসকগোষ্ঠীর আধিপত্য বিস্তার ঘটে দ্বিবিধ পদ্ধতি অনুযায়ী; একদিকে থাকে বলপ্রয়োগ, ভীতি প্রদর্শন এবং অন্যদিকে থাকে প্রচলিত ব্যবস্থার প্রতি জনগণের প্রতীতি নির্মাণের নানা বন্দোবস্ত। শাসনক্ষমতার এই দ্বিবিধ অথচ মিশ্র প্রকরণকে বিশ্লেষণ করতে গিয়ে তিনি গ্রীক উপকথায় বর্ণিত অর্ধমানব অর্ধ পশুর (Centaur) উদাহরণ দিচ্ছেন। এর অর্থ শাসকগোষ্ঠীর আধিপত্যের দুটি দিক, পাশব আচরণের সঙ্গে থাকে সম্মতি আদায়ের প্রচেষ্টা, হিংসা আর উন্নয়ন চলে একযোগে। গ্রামশ্চীর মতে দ্বিতীয় মানবিক পথে সম্মতি নির্মাণের শাসকগোষ্ঠী সুলভ প্রচেষ্টা বা হেগেমনি হচ্ছে শাসিতশ্রেণীগুলিকে রাজনৈতিক মতাদর্শগত নেতৃত্বদান। হেগেমনিকে তিনি বলপ্রয়োগ ভিত্তিক আধিপত্য (Domination) থেকে আলাদা করছেন।


এই প্রসঙ্গে মনে রাখতে হবে যে হেগেমনির ধারণা মূল ধারার মার্কসীয় চিন্তায় নতুন নয়। 1880-র দশকেই প্লেখানভ শব্দটি ব্যবহার করেন। তাঁর কাছে এর অর্থ রাশিয়ায় জারতন্ত্রকে উচ্ছেদ করতে শ্রমিক শ্রেণীর নেতৃত্বে (hegemonic) কৃষক ও অন্যান্য নিপীড়িত শ্রেণীকে বিপ্লবে সামিল করা। লেনিনও একই রকমভাবে প্রলেতারীয় শ্রেণীর নেতৃত্বে বুর্জোয়া গণতান্ত্রিক বিপ্লব গড়ে তোলার কথা বলেন। লেনিনের কাছে হেগেমনির অর্থ শ্রমিক শ্রেণীর নেতৃত্বে ব্যাপক গণঅভ্যুত্থান গড়ে তোলা। কিন্তু গ্রামশ্রী এই ধারণাকে ব্যবহার করেছেন সম্পূর্ণ অন্যভাবে। প্রিজন নোটবুকস-এ তিনি মন্তব্য করছেন যে রাষ্ট্রশক্তি দখল করার এটি একটি কৌশল। কোন সামাজিক গোষ্ঠী যদি রাষ্ট্র ক্ষমতা দখল করতে সচেষ্ট হয় তাহলে প্রথমে তাকে সমাজের অন্যান্য গোষ্ঠীর ওপর নেতৃত্ব স্থাপন করতে হবে, তাদের আস্থা অর্জন করতে হবে। এই আস্থা অর্জন করার কর্মসূচীটি হচ্ছে মতাদর্শগত আধিপত্য বিস্তারের সংগ্রাম। এর কয়েকটি বৈশিষ্ট্যের উল্লেখ আমরা পাই তাঁর নোটস অন দি ইটালিয়ান হিস্টরী এবং সাম আসপেকটস অফ সাদার্ন কোশ্চেন প্রবন্ধে।


  • শ্রমিক শ্রেণীকে হেগেমনিক হতে গেলে তাদের অন্যান্য নিপীড়িত শ্রেণীগুলির স্বার্থের প্রতিও গুরুত্ব দিতে হবে এবং নিজেদের স্বার্থের সঙ্গে একযোগে প্রকাশ করতে হবে। একমাত্র এই পথ ধরেই বহুশ্রেণীভিত্তিক গণ আন্দোলন গড়ে উঠবে। গ্রামশ্রী প্রাক-ফরাসী বিপ্লবের পর্যায়ে উদীয়মান বুর্জোয়াশ্রেণীর নিজ শ্রেণী স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে অন্যান্য মুক্তিকামী শ্রেণীর সঙ্গে একযোগে বৃহত্তর আন্দোলন গড়ে তোলার উদাহরণ এই প্রসঙ্গে উল্লেখ করছেন।


  • মতাদর্শগত আধিপত্য গড়ে তোলা প্রসঙ্গে গ্রামশ্রী জাতীয় জনপ্রিয় গণতান্ত্রিকতার (National Popular) ধারণা নিয়ে আসছেন। বুর্জোয়া শ্রেণীর মতাদর্শগত আধিপত্য প্রতিষ্ঠা এবং এই শাসনের প্রতি জনগণের আস্থা গড়ে ওঠার পেছনে যে কৌশল কাজ করেছিল তা হচ্ছে নিজেদের সংকীর্ণ শ্রেণীস্বার্থের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে সামত্ত বিরোধী জনপ্রিয় গণতান্ত্রিক আকাঙ্ক্ষার সমর্থনে সক্রিয় ভূমিকা গ্রহণ করা। ফলতঃ বুর্জোয়া শ্রেণীর নেতৃত্বের প্রতি জনগণের স্বতঃস্ফূর্ত সম্মতির দৃঢ় ভিত্তি প্রতিষ্ঠিত হয়। গ্রামশ্চীও শ্রমিক শ্রেণীর মতাদর্শগত আধিপত্য গড়ে তোলার ক্ষেত্রে অনুরূপ ব্যাপক গণভিত্তিক জনপ্রিয় খোলামেলা কর্মসূচী গ্রহণ করার কথা বলেছেন যাতে পুঁজিবাদবিরোধী পাল্টা মতাদর্শ গড়ে তোলার আন্দোলনে শ্রমিকশ্রেণীর নেতৃত্বে ব্যাপক জনসমাবেশ গড়ে তোলা যায়।


গ্রামশ্রী তাঁর রাজনীতি চর্চায় সবচেয়ে বেশী গুরুত্ব দিচ্ছেন মতাদর্শগত আধিপত্য নির্মাণের ক্ষেত্রটির ওপর। তাঁর মতে সংগ্রামের মূল ক্ষেত্রটি হচ্ছে নাগরিক সমাজ, যেখানে শাসকগোষ্ঠীর মতাদর্শগত আধিপত্য বিরাজ করে নানা প্রতিষ্ঠানের মধ্য দিয়ে এবং সমাজের সর্বত্র এর ফলে যে প্রচলিত মূল্যবোধ, ধ্যান-ধারণা (Common sense) বিরাজ করে তা প্রচলিত ব্যবস্থাকে টিকিয়ে রাখার পক্ষে সহায়ক শক্তি হিসেবে কাজ করে। নানা সামাজিক প্রতিষ্ঠান, প্রক্রিয়া, চিহ্ন, প্রচারকার্য, রেডিও, সিনেমার মধ্য দিয়ে এই নিম্নবর্গের জনগণ প্রতিনিয়ত প্রচলিত শাসনব্যবস্থার সহায়ক মূল্যবোধ আত্মস্থ করে, শাসকগোষ্ঠীর নির্দেশিত পথে আস্থা জ্ঞাপন করে। এই আস্থা নির্মাণের বিরুদ্ধে গ্রামশ্চী শ্রমিকশ্রেণীর নেতৃত্বে দীর্ঘ সাংস্কৃতিক সংগ্রাম গড়ে তোলার ওপর জোর দিচ্ছেন, উদ্দেশ্য শাসক-গোষ্ঠীর নেতৃত্বে গড়ে ওঠা দীর্ঘলালিত মতাদর্শগত আধিপত্য, প্রচলিত বিশ্বাসে ভাঙ্গন ধরিয়ে সমালোচনামূলক সচেতনতার সঞ্চার ঘটানো।


এইভাবে গ্রামশ্চী মার্কসীয় রাজনীতি চর্চার বিস্তার ঘটাচ্ছেন। অথচ গোঁড়া মার্কসবাদী রাজনীতি চিন্তায় রাজনীতি বলতেই বোঝায় শুধুমাত্র রাষ্ট্রযন্ত্রকে দখল করার সংগ্রাম। শাসক ও শাসিত শ্রেণীগুলির মধ্যেকার সংগ্রাম যেন মূলত রাষ্ট্রশক্তির দখলের মধ্যেই সীমাবদ্ধ, এর বাইরে সব কিছুই অপ্রয়োজনীয়। তাই রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করলেই সবকিছুর বিশেষ করে রাজনীতিরও অবসান ঘটে। এই রাষ্ট্রকেন্দ্রিক রাজনীতিক ধারণার বাইরে বেড়িয়ে এসেছেন গ্রামশ্রী। তাঁর মতে হেগেমনি বা মতাদর্শগত নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠা করার সংগ্রাম শুরু করা উচিত অনেক আগে থেকে। শুধুমাত্র রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করলেই হেগেমনি নিজের থেকে প্রতিষ্ঠিত হয় না। নাগরিক সমাজ হচ্ছে এই হেগেমনি প্রতিষ্ঠার স্থান যেখানে বুদ্ধিজীবীদের ভূমিকা এই কার্য সম্পাদনে সবচেয়ে প্রাথমিক ভূমিকা পালন করে। গ্রামশ্রী সমাজের দুই গোষ্ঠীর বুদ্ধিজীবীদের মধ্যে বিভাজন রেখা টানছেন। প্রথমগোষ্ঠীতে আছে সেই সমস্ত বুদ্ধিজীবীরা যারা গৃহীত অর্থে প্রবল পণ্ডিত এবং গণবিচ্ছিন্ন।


কারণ জনগণ তাদের বুঝতে অপারগ। অন্যদিকে আরেক গোষ্ঠীর বুদ্ধিজীবীরা আছে যারা জনগণের দৈনন্দিনতা, আবেগ অনুভূতি অনুধাবনে সমর্থ এবং এরা জনমানসে বিরাজমান পরস্পরবিরোধী বীক্ষা, চিত্তাচেতনাকে সুসংবদ্ধ করে সচেতন স্তরে উন্নীত করতে সচেষ্ট। গ্রামশ্চী এই দ্বিতীয় গোষ্ঠীকে চিহ্নিত করেছেন অরগ্যানিক বুদ্ধিজীবী বলে, যাদের সঙ্গে জনগণের সম্পর্ক নিবিড় এবং সক্রিয়। এদের মধ্য দিয়েই শাসকগোষ্ঠীর হেগেমনি প্রতিষ্ঠিত হয়, শাসকগোষ্ঠী নির্দেশিত নীতিগুলিকে আত্মস্থ করে সাধারণ জনগণ সেগুলির প্রতি সহমত পোষণ করে। শাসকগোষ্ঠীর নেতৃত্বের প্রতি জনগণের এই স্বতঃস্ফূর্ত সমর্থন আসে স্বাভাবিক পথ ধরেই, জোর করে ওপর থেকে চাপিয়ে দিয়ে নয়। গ্রামশ্রী তাঁর প্রিজন নোটবুকস-এ হেগেমনি প্রতিষ্ঠার আদর্শায়িত রূপ হিসেবে উল্লেখ করছেন ফরাসী বিপ্লবে জ্যাকোবিনদের ভূমিকার কথা। জ্যাকোবিনরা রাষ্ট্রক্ষমতা দখলের আগে উদীয়মান বুর্জোয়াশ্রেণীর দাবী দাওয়া, আকাঙ্ক্ষার সঙ্গে অন্যান্য সমস্ত সামাজিক গোষ্ঠিগুলির আকাঙ্ক্ষাকে যুক্ত করে এক সামগ্রিক জোট সৃষ্টি করে, দেশব্যাপী তাদের মতাদর্শগত নেতৃত্ব গ্রহণীয় হয়, আধুনিক ফরাসী জাতি দৃঢ় ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত হয়।


কিন্তু এর বিপরীতে বিশেষ করে ইটালীতে হেগেমনির পরিধি ছিল অত্যন্ত সীমিত। ইটালী জাতির আত্মপ্রকাশ এবং সংযুক্তিকরণ ঘটে জ্যাকোবিন পন্থায় নয় বরং জনগণকে নিষ্ক্রিয় রেখে, ওপর থেকে আমলাতান্ত্রিক কায়দায়, সংস্কারের পথ ধরে শাসকগোষ্ঠীর প্রভুত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়। ফলে রাজনৈতিক ব্যবস্থা ইতালীতে ছিল দুর্বল এবং দমনপীড়ন নির্ভর।


গ্রামশ্চী তাঁর হেগেমনির ধারণার মধ্য দিয়ে গোঁড়া মার্কসবাদসুলভ “শেষ বিচারে অর্থনীতিই সব কিছুর নির্ধারক ” এই যান্ত্রিক অবস্থানকে অস্বীকার করেছেন। তিনি বিপ্লবী রাজনীতি চর্চার ক্ষেত্র হিসেবে ধর্ম, সংস্কৃতি, জীবনচর্চা ইত্যাদির ওপর সবচেয়ে বেশী গুরুত্ব দেন। শাসকগোষ্ঠী শুধুমাত্র কর্তৃত্ব দখল করেই ক্ষান্ত হয় না, জনগণের সম্মতিও আদায় করে। নাগরিক সমাজের বিপুল সাংস্কৃতিক, নৈতিক কর্মকাণ্ডের মধ্যে রাষ্ট্র এবং শাসকগোষ্ঠীর অনুকূলে সম্মতি নির্মাণের প্রক্রিয়া অব্যাহত থাকে। তবে গ্রামশ্চী এ বিষয়ে গোঁড়া মার্কসবাদীদের অনুসরণ করে এই সম্মতি, বিশ্বাস, ধ্যান-ধারণাকে 'ভ্রান্ত চেতনা' বলে চিহ্নিত করেননি বা কখনই এই সিদ্ধান্তে আসেননি যে শাসকগোষ্ঠীর মতাদর্শগত আধিপত্য নিম্নবর্গকে পুরোপুরি গ্রাস করে মোহাবিষ্ট করে রাখে। বরং তিনি মনে করেছেন যে নিম্নবর্গের মানস-জগৎকে শাসকগোষ্ঠীর ভাবাদর্শ অনেকটা আপ্লুত করলেও তাদের দৈনন্দিন জীবনচর্চা বা বোধের মধ্যে এমন কিছু অস্ফুট উপাদান থাকে যা শাসকগোষ্ঠীর মতাদর্শ নিরপেক্ষ অথবা কখনও কখনও বিরোধী সম্ভাবনা পূর্ণ। নিম্নবর্গের ধর্মবিশ্বাসে, নৈতিকতার ধারণায় ‘অন্য’ বা প্রতিরোধী উপাদান থেকেই যায়। গ্রামশ্চী তাঁর পাল্টা মতাদর্শগত আধিপত্য নির্মাণের প্রকল্পে এই ক্ষেত্রটিকে গুরুত্ব দিচ্ছেন। এই প্রকল্প প্রতিষ্ঠার জন্যে নিম্নবর্গের অগ্রণী অংশ বা শ্রমিক শ্রেণীর নেতৃত্বে অন্যান্য শ্রেণীর সমন্বয় গড়ে তোলা প্রয়োজন। বুর্জোয়া শাসকগোষ্ঠী যেমন পীড়নমূলক যন্ত্র রাষ্ট্রের সমান্তরাল নাগরিক সমাজকে গড়ে-পিঠে নেবার চেষ্টা করে, তেমনি শ্রমিক শ্রেণীর নেতৃত্বে নিম্নবর্গের মানুষজন নাগরিক সমাজের ব্যাপক সাংস্কৃতিক আধিপত্য বিস্তারের কর্মকাণ্ডে ফাটল ধরায়, জনজীবনে, মানসিকতায় স্বাতন্ত্র্য বিরোধী কিন্তু অস্ফুট উপাদানগুলিকে সংহত করে, উন্নতি ঘটিয়ে পাল্টা-মতাদর্শগত আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করে।