সমাজের শ্রেণী-কাঠামো : মুখ্য শ্রেণী ও গৌণ শ্রেণী, শ্রেণীসমূহের মধ্যে পার্থক্যের ভিত্তি

শ্রেণী-কাঠামোর ধারণা

সমাজের শ্রেণী-কাঠামো গড়ে উঠে সমাজের সকল শ্রেণী ও গোষ্ঠী, তাদের সম্পর্ক বিন্যাস এবং বিভিন্ন সামাজিক স্তরকে নিয়ে। সমাজে বিরোধমুলক উৎপাদন পদ্ধতি থাকলে পরস্পরবিরোধী শ্রেণীও থাকবে। কারণ সংশ্লিষ্ট উৎপাদন পদ্ধতিই সমাজকে শ্রেণীবিভক্ত করে। সমাজের শ্রেণী-চরিত্র সমাজের সমকালীন উৎপাদন পদ্ধতির পরিপ্রেক্ষিতে নির্ধারিত হয়ে থাকে। সমাজে একটি উৎপাদন পদ্ধতির অবসান ঘটলে, তার জায়গায় নতুন আর একটি উৎপাদন পদ্ধতির আবির্ভাব ঘটে। তখন পুরাতন শ্রেণীর জায়গায় আসে নতুন একটি শ্রেণী। তারফলে সমাজের শ্রেণী-চরিত্রের পরিবর্তন ঘটে এবং শ্রেণী কাঠামো বদলে যায়। প্রকৃত প্রস্তাবে সমাজের শ্রেণী-কাঠামোর ধারণাটি বিশেষভাবে জটিল। বাস্তবে সামাজিক শ্রেণীগুলিকে অপরিবর্তনীয় গোষ্ঠী বলা যায় না। সমাজের শ্রেণীকাঠামোর মধ্যে মুখ্য শ্রেণী, গৌণ ও মধ্যবর্তী স্তর থাকে। এই সমস্ত গোষ্ঠী ও স্তরের মধ্যে সমাজস্থ ব্যক্তিবর্গের আরোহণ ও অবরোহণের ঘটনা নিরস্তর ঘটে থাকে।


মার্কসীয় ধারণা অনুসার বৈষম্যমূলক বা বিরোধমূলক সমাজমাত্রেই হল শ্রেণীবিভক্ত ও শ্রেণী-শাসিত সমাজ। এই ধরনের সমাজে সব সময়েই দু'ধরনের শ্রেণী থাকে। এই দু'ধরনের শ্রেণী হল: 

  • মুখ্য (basic) শ্রেণী ও 

  • গৌণ (non-basic) শ্রেণী।


মুখ্য শ্রেণী

বিরোধমূলক ও শ্রেণীবিভক্ত প্রত্যেক সমাজেই একটি বিশেষ উৎপাদন-পদ্ধতি বা ব্যবস্থা বর্তমান থাকে। কতকগুলি শ্রেণী এই উৎপাদন পদ্ধতি ও ব্যবস্থা গড়ে তুলেছে। তাদের সাহায্য-সহযোগিতা ছাড়া এই উৎপাদন-ব্যবস্থা চলতে পারে না। এই শ্রেণীগুলিকেই সংশ্লিষ্ট সমাজের মুখ্য শ্রেণী বলে। মার্কসবাদীদের মতানুসারে শ্রেণীবিভক্ত সকল সমাজে দুটি মুখ্য শ্রেণী থাকে। এই দুটি মুখ্য শ্রেণীর মধ্যেই শ্রেণী-সংগ্রাম সংঘটিত হয়। উৎপাদন পদ্ধতি বা ব্যবস্থার মধ্যে যে বিরোধ বর্তমান থাকে, তা মুখ্য দুটি শ্রেণীর পারস্পরিক সম্পর্ক ও সংগ্রামের মাধ্যমে প্রকাশিত হয়। মুখ্য শ্রেণীর উদাহরণ হিসাবে দাসসমাজে দাস-মালিক ও দাস, সামন্ততান্ত্রিক সমাজে সামন্তপ্রভু ও ভূমিদাস এবং ধনতান্ত্রিক সমাজে পুঁজিপতি ও প্রলেতারিয়েতের কথা বলা হয়।


গৌণ শ্ৰেণী

শ্রেণীবিভক্ত সকল সকাজে দু'টি মুখ্য শ্রেণীর পাশাপাশি গৌণ শ্রেণীও থাকে। গৌণ শ্ৰেণী উত্তরণশীল শ্রেণী হিসাবেও পরিচিত। গৌণ শ্রেণীর মধ্যে পূর্বতন উৎপাদন প্রণালীর সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত অবশিষ্টাংশ থাকে; আবার বিশেষ কোন আর্থনীতিক কাঠামোর উৎপাদন ব্যবস্থার ভ্রুণ থাকে। সমাজে গৌণ শ্রেণীর সংখ্যা বহু ও বিভিন্ন হয়ে থাকে। দাস-সমাজে মুখ্য শ্রেণী হিসাবে দাস-মালিক এবং দাস ছাড়াও দরিদ্র কৃষক, কারুশিল্পী প্রভৃতি গৌণ শ্রেণী থাকে। সামন্ততান্ত্রিক সমাজে যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নতি ঘটে। এই সময় নূতন বণিক সম্প্রদায়ের উদ্ভব হয়। তা ছাড়া কারিগর ও হস্তশিল্পীদের নিয়ে গঠিত শ্রেণীও থাকে। পুঁজিপতি ও প্রলেতারিয়েত এই দুই মুখ্য শ্রেণী ছাড়াও ধনতান্ত্রিক সমাজে অন্যান্য গৌণ শ্রেণী থাকে। এ ক্ষেত্রে উদাহরণ হিসাবে ছোট-খাট সম্পত্তির মালিক, ব্যবসায়ী, কারিগর, কৃষক, কারুশিল্পী প্রভৃতির কথা বলা হয়। ধনতান্ত্রিক সমাজে, জমিদারও থাকতে পারে।


পেটি বুর্জোয়া শ্রেণী:

মার্কসবাদী আলোচনায় ধনতান্ত্রিক সমাজে 'পেটি বুর্জোয়া' (petty bourgeoisie) নামে একটি শ্রেণীর কথা বলা হয়। এই শ্রেণীর মধ্যে অল্প সম্পত্তির মালিক এবং ব্যবসায়ী থাকে। ধনতান্ত্রিক সমাজের পেটি বুর্জোয়াদের মধ্যে থাকে শহরাঞ্চলের পেটি বুর্জোয়া এবং মাঝারি ও দরিদ্র পর্যায়ের কৃষক সমাজ। সমাজের শ্রেণী-কাঠামোতে আর্থনীতিক বিচারে এই শ্রেণীটির অবস্থান পুঁজিপতি বা বুর্জোয়া ও প্রলেতারিয়েতের মাঝখানে। প্রকৃত প্রস্তাবে পেটি বুর্জোয়া শ্রেণী হল সম্পত্তির মালিক শ্রেণী। এই সূত্রে পুঁজিপতিদের সঙ্গে এদের সুসম্পর্ক বর্তমান থাকে। আবার প্রলেতারিয়েতের সঙ্গেও এদের সংযোগ পরিলক্ষিত হয়। কারণ পেটি বুর্জোয়ারা উৎপাদনের ক্ষেত্রে নিজেদের শ্রমশক্তি নিয়োগ করে। তা ছাড়া এদের উপর পুঁজির প্রতিকুল প্রতিক্রিয়াও পরিলক্ষিত হয়। পুঁজিবাদী সমাজব্যবস্থায় সংখ্যাগত বিচারে এই পেটি বুর্জোয়া শ্রেণীর অবস্থান তাৎপর্যপূর্ণ। মার্কসবাদীদের মতানুসারে এই শ্রেণীটি কোন স্থায়ী শ্রেণী নয়। পুঁজিবাদী সমাজ ক্রমশঃ বিকশিত হতে থাকে। পুঁজি ও শিল্পের কেন্দ্রীভবন ঘটে। কারিগরী বিকাশ ত্বরান্বিত হয়। ছোট আকারের উৎপাদন ও ব্যবসাবাণিজ্য বন্ধ হয়ে যায়। পুঁজির সঙ্গে বিরোধ বাধে। পেটি বুর্জোয়াদের অস্তিত্ব অনিশ্চিত হয়ে পড়ে। পুঁজিপতিদের সঙ্গে অসম প্রতিযোগিতায় তারা পারে না। পেটি বুর্জোয়াদের একটি বড় অংশ নিঃস্ব হয়ে পড়ে। তারা প্রলেতারিয়েতকরণের পথে এগোতে থাকে এবং অবধারিতভাবে প্রলেতারিয়েতের পরিণত হয়। তবে পেটি বুর্জোয়াদের একটি অংশ বাড়তি সম্পদ অর্জনের সূত্রে সম্পদশালী হয়ে থাকে। পেটি বুর্জোয়াদের এই অংশটি বুর্জোয়াদের সামিল হয়ে পড়ে।


বুদ্ধিজীবী সম্প্রদায়:

ধনতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থায় বুদ্ধিজীবী সম্প্রদায় নামে আর একটি সামাজিক স্তরের কথা বলা হয়। ধনতান্ত্রিক সমাজের শ্রেণী-কাঠামোতে এই বুদ্ধিজীবী সম্প্রদায়ের গুরুত্ব ও তাৎপর্য অস্বীকার করা যায় না। বুদ্ধিজীবীদের সামাজিক সম্প্রদায় হিসাবে উল্লেখ করা হয়। একটি পৃথক সামাজিক শ্রেণী হিসাবে বুদ্ধিজীবীদের গণ্য করা হয় না। এর কারণ হল সামাজিক উৎপাদন প্রক্রিয়ায় বুদ্ধিজীবীদের স্বতন্ত্র কোন স্থান থাকে না। উৎপাদন- উপাদানের মালিকানা এঁদের হাতে থাকে না। পণ্যসামগ্রীর উৎপাদনের ক্ষেত্রে এঁদের কোন প্রত্যক্ষ অবদান থাকে না। বৈষয়িক মূল্যযুক্ত কোনকিছু এঁরা তৈরী করেন না। তা ছাড়া কোন বিশেষ শ্রেণী থেকে বুদ্ধিজীবীরা আসেন না। বুর্জোয়া-প্রলেতারিয়েত নির্বিশেষে সকল শ্রেণী থেকেই এদের আসতে দেখা যায়। সমাজের বিভিন্ন গৌণ শ্রেণীর ভিতর থেকেও বুদ্ধিজীবীরা আসেন। এঁদের মধ্যে বুর্জোয়া, পেটি বুর্জোয়া, প্রলেতারিয়েত থাকে। আবার এদের মধ্যে একটি অংশকে বৈপ্লবিক সমাজতান্ত্রিক আখ্যা দেওয়া হয়। অর্থাৎ বুদ্ধিজীবীরা কোন স্বতন্ত্র শ্রেণী গঠন করেন না। ডাক্তার, উকিল, শিক্ষক, গবেষক, লেখক, শিল্পী, উচ্চ বেতনের কর্মচারী, বিজ্ঞানী, প্রযুক্তিবিদ প্রভৃতি ব্যক্তিবর্গ বুদ্ধিজীবী সম্প্রদায়ের অন্তর্ভুক্ত বলে বিবেচিত হয়। সাধারণত বুদ্ধিজীবীদের ধনতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থার স্থিতিশীলতা সংরক্ষণে আগ্রহী দেখা যায়। বুদ্ধিজীবী সম্প্রদায়ের অর্থ ও প্রভাব-প্রতিপত্তির উৎস হল বুর্জোয়া সমাজব্যবস্থা। তাই তাঁরা এই সমাজব্যবস্থায় পরিবর্তনের পক্ষপাতী নন। তবে বুদ্ধিজীবীদের একটি অংশের মধ্যে বৈপ্লবিক সমাজতান্ত্রিক চিন্তাধারা পরিলক্ষিত হয়। এঁরা সর্বহারা শ্রেণীর স্বার্থের মুখপাত্র হিসাবে ভূমিকা পালন করে থাকেন। যাইহোক মার্কসীয় দার্শনিকরা বৈপ্লবিক কর্মসূচী রূপায়ণের ক্ষেত্রে বুদ্ধিজীবীদের ভূমিকা সম্পর্কে সব সময় সন্দেহ পোষণ করে থাকেন।


বুদ্ধিজীবী সম্প্রদায়ের প্রকৃতি:

বৌদ্ধিক জগৎ বা বৌদ্ধিক কাজকর্মের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিবর্গকেই সামগ্রিকভাবে বুদ্ধিজীবী সম্প্রদায় বলা হয়। এই সম্প্রদায়ের ব্যক্তিরা পেশাগতভাবে বৌদ্ধিক কাজকর্মের সঙ্গে সংযুক্ত থাকেন। এঁরা সমাজের মুখ্য বা গৌণ শ্রেণীর অন্তর্ভুক্ত নন। একটি পৃথক সম্প্রদায় হিসাবে এঁদের একটি স্বতন্ত্র সামাজিক স্তর আছে। ধনতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থায় বুদ্ধিজীবীরা বিভিন্ন সামাজিক শ্রেণী থেকে আসেন। বিভিন্ন মুখ্য শ্রেণীর মধ্যবর্তী স্তরে বুদ্ধিজীবী সম্প্রদায়ের অবস্থান। বুদ্ধিজীবীরা কখনই একটি স্বতন্ত্র শ্রেণী হিসাবে প্রতিপন্ন হতে পারেন না। এঁরা কখনই একটি আলাদা শ্রেণীর অন্তর্ভুক্ত ছিলেন না। বাস্তবে বুদ্ধিজীবীরা বিভিন্ন শ্রেণী-স্বার্থের মুখপাত্র ও সমর্থক হিসাবে ভূমিকা পালন করে থাকেন। বুদ্ধিজীবীদের একটি সম্প্রদায় হিসাবে উল্লেখ করা হলেও, এই সম্প্রদায়ের মধ্যে কোন সংহত প্রকৃতি পরিলক্ষিত হয় না। বুর্জোয়া, পেটি বুর্জোয়া, বৈপ্লবিক সমাজতান্ত্রিক প্রভৃতি বিভাগ বুদ্ধিজীবীদের মধ্যে পরিলক্ষিত হয়। বুদ্ধিজীবী সম্প্রদায়ের একটি অংশকে সাবেকী বলে চিহ্নিত করা হয়। বুদ্ধিজীবীদের সাবেকী অংশ বলতে ডাক্তার, উকিল ও শিল্পীদের বোঝায়। আবার বুদ্ধিজীবী সম্প্রদায়ের ক্রমবর্ধমান অংশ হিসাবে বিজ্ঞানী ও প্রযুক্তিবিদদের চিহ্নিত করা হয়। সকল বুদ্ধিজীবীই বৌদ্ধিক ক্রিয়াকলাপের সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন দায়িত্ব সম্পাদন করে থাকেন।


বুদ্ধিজীবী সম্প্রদায়ের ভূমিকা:

সমাজে যে সমস্ত শ্রেণী আছে তাদের নিজস্ব শ্রেণী-স্বার্থ আছে। প্রত্যেক শ্রেণীই নিজেদের শ্রেণী-স্বার্থের অনুকূলে বুদ্ধিজীবী সম্প্রদায়কে ব্যবহার করার ব্যাপারে উদ্যোগী হয়। এই কারণে শাসকশ্রেণীর পক্ষে যেমন বুদ্ধিজীবীদের অবস্থান পরিলক্ষিত হয়, তেমনি শাসিত শ্রেণীর পক্ষে বা শাসক শ্রেণীর বিরুদ্ধে বুদ্ধিজীবীদের অবস্থান পরিলক্ষিত হয়। বুদ্ধিজীবীরা সমাজের কোন না কোন শ্রেণীর বৌদ্ধিক মুখপাত্র হিসাবে ভূমিকা পালন করে। নিজেদের স্বতন্ত্র শ্রেণী-স্বার্থের ভিত্তিতে বুদ্ধিজীবীরা নিজেদের একটি স্বতন্ত্র শ্রেণী হিসাবে প্রতিপন্ন করতে পারেন না। সমাজে শ্রেণী-সংগ্রাম প্রকট-প্রবল না হওয়া অবধি বুদ্ধিজীবীদের ভূমিকা থাকে অঙ্গীকারহীন। তখন এই সম্প্রদায়ের ব্যক্তিবর্গকে সুবিধাবাদী নীতির অনুগামী হিসাবে দেখা যায়। কিন্তু এক সময় সমাজে শ্রেণী-সংগ্রাম প্রকট হয়ে পড়ে। শ্রেণী-সংগ্রামের তীব্রতা বৃদ্ধি পায়। তখন বুদ্ধিজীবী সম্প্রদায়ের মানুষজন বাধ্য হয়ে বিদ্যমান শ্রেণীসমূহের মধ্যে কোন না কোন শ্রেণীর পক্ষ অবলম্বন করে থাকেন।


মধ্যবিত্ত শ্রেণী:

বিরোধমূলক সমাজব্যবস্থার শ্রেণী-কাঠামো পর্যালোচনা করতে গিয়ে আর একটি শ্রেণী সম্পর্কে আলোচনা করা হয়। এই শ্রেণীটি হল মধ্যবিত্ত শ্রেণী। মধ্যবিত্ত শ্রেণী যে-কোন সমাজের মুখ্য দুটি শ্রেণীর মধ্যবর্তী স্তরে বর্তমান থাকে। মানব-সমাজের ক্রমবিকাশের ধারা পর্যালোচনা করলে মধ্যবিত্ত শ্রেণীর চেহারা-চরিত্র সম্পর্কে সম্যকভাবে অবহিত হওয়া যায়। সমাজবিকাশের ধারায় বিভিন্ন স্তরের পরিপ্রেক্ষিতে মধ্যবিত্ত শ্রেণীর কোন নির্দিষ্ট আকার পরিলক্ষিত হয় না। অর্থাৎ মধ্যবিত্ত শ্রেণীর অবস্থা কখনই স্থিতিশীল নয়। মধ্যবিত্ত শ্রেণীর অন্তর্ভুক্ত অনেকেই উৎপাদন-উপাদানের মালিকানা অর্জন করে। অর্থাৎ মধ্যবিত্ত শ্রেণীর এই অংশটি তখন সম্পত্তিবান শ্রেণীর সামিল হয়। সুতরাং মধ্যবিত্ত শ্রেণীর এই অংশটি তখন সমাজের একটি মুখ্য শ্রেণীর অন্তর্ভুক্ত হয়ে পড়ে। এই মধ্যবিত্ত শ্রেণীর অনেকে আবার আর্থনীতিক ক্ষেত্রে বিপর্যস্ত ও দুর্দশাগ্রস্ত হয়ে পড়ে। তখন তারা প্রলেতারিয়েতে পরিণত হয়। প্রকৃত প্রস্তাবে সমাজের মুখ্য শ্রেণীর অবস্থান ও মর্যাদার অদল-বদল ঘটলে মধ্যবিত্ত শ্রেণীর অবস্থান ও মর্যাদার পরিবর্তন সূচীত হয়। উদাহরণ হিসাবে বলা যায় যে সামন্ততান্ত্রিক সমাজব্যবস্থায় দুটি মুখ্য শ্রেণী হল সামন্তপ্রভূ ও ভূমিদাস। এই দুই মুখ্য শ্রেণীর মধ্যবর্তী স্তরে থাকে উদীয়মান বুর্জোয়া শ্রেণী। সামন্ত সমাজে মধ্যবিত্ত শ্রেণী বলতে এই বুর্জোয়াদের বোঝায়। এই সময় সমাজের আর্থ-রাজনীতিক ক্ষেত্রে বুর্জোয়াদের ভূমিকার কোন গুরুত্ব থাকে না। কিন্তু সমাজবিকাশের পরবর্তী স্তরে পুঁজিবাদী সমাজব্যবস্থায় বুর্জোয়ারা সম্পত্তিবান শ্রেণী হিসাবে মুখ্য শ্রেণীতে পরিণত হয়। বুর্জোয়াদের আর্থনীতিক সঙ্গতি ও ক্ষমতা এবং সামাজিক মর্যাদা বৃদ্ধি পায়। এই সময় ছোট ছোট ব্যবসায়ী, কৃষক, অফিস কর্মচারী, বাস্তুকার, শহর ও গ্রামের পেটি বুর্জোয়া প্রভৃতি ব্যক্তিবর্গ মধ্যবিত্ত শ্রেণীর অন্তর্ভুক্ত বলে বিবেচিত হয়। প্রসঙ্গত উল্লেখ করা দরকার যে মধ্যবিত্ত শ্রেণী নামে কোন স্বতন্ত্র শ্রেণীর কথা মার্কস এঙ্গেলস বলেননি। তাঁরা সমাজের দুটি মুখ্য শ্রেণীর মধ্যবর্তী পর্যায়ে মধ্যবিত্ত বর্গ বা স্তরের কথা বলেছেন। অর্থাৎ মার্কস-এঙ্গেলস মধ্যবিত্ত শ্রেণীর পরিবর্তে মধ্যবর্তী স্তরের কথা বলেছেন। মার্কসবাদীদের অভিমত অনুসারে এই মধ্যবর্তী স্তর গঠিত হয় বিভিন্ন সামাজিক গোষ্ঠীকে নিয়ে। এই সমস্ত গোষ্ঠীর মধ্যে পেটি বুর্জোয়া ও অন্যান্য গোষ্ঠী থাকে।


শ্ৰেণী-কাঠামো সম্পর্কিত অ-মার্কসবাদী তাত্ত্বিকদের অভিমত:

সমাজের শ্রেণী-কাঠামো সম্পর্কিত অ মার্কসবাদী তাত্ত্বিকদের ধারণা স্বতন্ত্র। তাঁরা সমাজের শ্রেণী-কাঠামোর অস্তিত্বের কথা স্বীকার করেন। কিন্তু মার্কসবাদীদের শ্রেণী সম্পর্কিত ধারণাকে অ-মার্কসবাদী তাত্ত্বিকরা স্বীকার করেন না। তাঁরা শ্রেণী-সংঘাতের ধারণাকেও অস্বীকার করেন। অ-মার্কসবাদী চিন্তাবিদরা মধ্যবিত্ত শ্রেণীর উদ্ভব এবং এই শ্রেণীর সম্প্রসারণ সম্পর্কিত মতবাদের উপর জোর দেন। এবং এইভাবে তাঁরা মার্কসবাদীদের শ্রেণী সম্পর্কিত মতবাদের বিরোধিতা করেন। এ প্রসঙ্গে জেসি বার্গার্ড, বার্ণস্টিন, ডেনিয়েল বেল, হবসন প্রমুখ চিন্তাবিদদের নাম বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। উপরিউক্ত অ-মার্কসাদী চিন্তাবিদদের অভিমত অনুসারে ধনতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থা মধ্যবিত্ত শ্রেণীর সমাজব্যবস্থায় রূপান্তরিত হয়েছে। বিষয়টিকে তাঁরা এভাবে ব্যাখ্যা করেছেন। বর্তমানে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির অভাবনীয় অগ্রগতি ঘটেছে। শিল্পোন্নত সমাজ বিশেষভাবে সমৃদ্ধ ও বিকশিত হয়েছে। তারফলে বিভিন্ন রকম বহু নতুন সম্ভাবনা ও সুযোগসুবিধার সৃষ্টি হয়েছে। এর স্বাভাবিক ফল হিসাবে সামাজিক সচলতা (social mobility) বৃদ্ধি পেয়েছে। এই সবের পাশাপাশি সামাজিক সম্পদের পুনর্বণ্টন, পুঁজির কেন্দ্রীভবনের বিপরীত প্রক্রিয়া, পুঁজির গণতন্ত্রীকরণ, মুনাফার পুনর্বণ্টন প্রভৃতি ঘটে। এর ফলে প্রলেতারিয়েতদের মধ্যে জীবনধারণের প্রক্রিয়ায় পরিবর্তন ঘটে। তারা আধুনিক সভ্যতার সুযোগ-সুবিধা গ্রহণ করে এবং ক্রমশঃ তথাকথিত বুর্জোয়া জীবনধারায় অভ্যস্ত হয়ে পড়ে। একে বলে প্রলেতারিয়েতদের শ্রেণীবিচ্যুতি। এই সমগ্র প্রক্রিয়াটির সারমর্ম হল শ্রমিক শ্রেণীর সংখ্যা হ্রাস, বুর্জোয়া প্রলেতারিয়েতের ব্যবধানের অবসান, বাবুশ্রেণীর কর্মী (white-collar workers) সংখ্যা বৃদ্ধি প্রভৃতি। এবং এর ফলে মধ্যবিত্ত শ্রেণীর ব্যাপক বিকাশ ও প্রসার ঘটে। সমাজজীবনের সর্বোচ্চ শক্তি হিসাবে মধ্যবিত্ত শ্রেণী আত্মপ্রকাশ করে। অ-মার্কসীয় চিন্তাবিদরা আয়ের মাপকাঠির পরিপ্রেক্ষিতে মধ্যবিত্ত শ্রেণীর সংখ্যা নির্ধারণ করে থাকেন। এঁদের মতানুসারে শিল্পোন্নত সমাজে বুর্জোয়া ও প্রলেতারিয়েতের মধ্যে ব্যবধান বিলুপ্ত হচ্ছে। অর্থাৎ এই দুটি শ্রেণীর অবসান ঘটেছে। তার জায়গায় গড়ে উঠছে মধ্যবিত্ত শ্রেণী। এঁদের অভিমত অনুসারে এটাই হল শ্রেণীহীন সমাজ। অর্থাৎ শিল্পোন্নত সমাজেই গড়ে উঠবে শ্রেণীহীন সমাজ।


মার্কসীর সমালোচনা:

সমাজের শ্রেণী-কাঠামো সম্পর্কিত অ-মার্কসবাদী চিন্তাবিদদের এই অভিমত মার্কসবাদীরা সমর্থন করেন না। মার্কসবাদীদের মতানুসারে সমাজের শ্রেণী-কাঠামো সম্পর্কিত উপরিউক্ত ধারণা খামখেয়ালীপূর্ণ ও সামঞ্জস্যহীন। এ হল ধনতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থার শ্রেণী-সংগ্রাম এবং বুর্জোয়া শ্রেণীর শাসন-শোষণকে আড়াল করার এক অপপ্রচেষ্টা। মার্কসবাদীদের মতানুসারে সমাজে উৎপাদন উপাদানগুলির মালিকানা মুষ্টিমেয় কিছু ব্যক্তির হাতে কেন্দ্রীভূত থাকলে বিরোধিতামূলক শ্রেণী-সমাজ থাকবে। সমাজে শাসন-শোষণ থাকবে, শোষক ও শোষিত শ্রেণী থাকবে, মুখ্য শ্রেণীর অবস্থান অব্যাহত থাকবে। এবং সমাজের দুটি মুখ্য শ্রেণীর মধ্যবর্তী পর্যায়ে মধ্যবিত্ত স্তর বা বর্গ থাকবে। সুতরাং অ-মার্কসবাদী সমাজবিজ্ঞানীদের উপরিউক্ত ধারণা বাস্তবতাবর্জিত ও অবৈজ্ঞানিক।


শ্রেণীসমূহের মধ্যে পার্থক্যের ভিত্তি

সকল শোষিত সমাজে শ্রেণীগত বিভাগ বর্তমান: আদিম সাম্যবাদী সমাজব্যবস্থায় মানুষ বিভিন্ন অংশে বিভক্ত ছিল না। তখন মানুষের মধ্যে বৈষম্য ছিল না। কালক্রমে আদিম সাম্যবাদী সমাজব্যবস্থা ভেঙ্গে পড়ে। তখনই বিভিন্ন অংশে মানুষ বিভক্ত হয়ে পড়ে। এই বিভাগ হল শ্রেণীগত। এই বিভাগ ব্যক্তিগত নয়। এই শ্রেণীগত বিভাগ নির্ধারণের একটি মূল মাপকাঠি আছে। এই মাপকাঠিটি হল উৎপাদন-উপকরণের সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক। সমাজে বিভিন্ন শ্রেণীর সৃষ্টি হয় উৎপাদন-উপকরণের উপর ব্যক্তিগত মালিকানার ভিত্তিতে। বৈষম্যমূলক সকল সমাজেই উৎপাদন-উপাদানের উপর ব্যক্তিগত মালিকানা বর্তমান থাকে। এবং এই কারণে এই রকম প্রতিটি সমাজই হল শোষণমূলক। এই সমস্ত সমাজে মানুষের মধ্যে শ্রেণীগত বিভাগ বর্তমান থাকে। এবং আদিম সাম্যবাদী সমাজের ভাঙ্গনের পর দাস-সমাজ থেকে শুরু করে ধনতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থা পর্যন্ত এই একই ধারা অব্যাহত থাকে।


সামাজিক উৎপাদন ব্যবস্থার অবস্থানগত পার্থক্য: বৈষম্যমূলক যে-কোন সমাজে ব্যক্তিবর্গের মধ্যে সামাজিক অবস্থান ও শ্রেণীগত পার্থক পরিলক্ষি হয়। এই পার্থক্য নির্ধারিত হয় সামাজিক উৎপাদন ব্যবস্থায় শ্রেণীসমূহের অবস্থান অনুসার। আবার উৎপাদন-উপাদানের সঙ্গে সম্পর্কের পরিপ্রেক্ষিতে সামাজিক উৎপাদন ব্যবস্থা একটি শ্রেণী অবস্থান নির্ভরশীল। যে-কোন সমাজে যে শ্রেণীগত পার্থক্য পরিলক্ষিত হয় তার উৎস নিহিত থাকে উৎপাদন-উপাদানের সঙ্গে শ্রেণীসমূহের পার্থক্যের মধ্যে। সুতরাং সামাজিক উৎপাদন ব্যবস্থায় শ্রেণীসমূহের অবস্থানগত পার্থক্য বর্তমান থাকে। এই পার্থক্যই সমাজজীবনের অন্য সকল ক্ষেত্রে পার্থক্যের জন্ম দেয় এবং তদনুসারে অন্যান্য সামাজিক সম্পর্ক নির্ধারিত হয়। সামাজিক উৎপাদন ব্যবস্থায় শ্রেণীগুলির অবস্থানগত পার্থক্যের ভিত্তিতে প্রত্যেক শ্রেণীর স্ব স্ব স্বার্থ, মতাদর্শ ও মানসিকতা গড়ে উঠে।


শোষক ও শোষিত শ্রেণী নির্ধারণের ভিত্তি: সমাজে শ্রেণীবিভাগের আর্থনীতিক ভিত্তি হল সম্পত্তির ব্যক্তিগত মালিকানা। সমাজে শ্রেণীসমূহের উদ্ভব ও শ্রেণী-সংঘাতের মূল কারণ হল এই সম্পত্তির ব্যক্তিগত মালিকানা। সমাজে পরস্পর-বিরোধী শ্রেণীর সৃষ্টি হয় উৎপাদন উপাদানের উপর ব্যক্তিগত মালিকানার ভিত্তিতেই। উৎপাদন-উপাদানের উপর যাদের মালিকানা থাকে তারাই হল শাসকশ্রেণী। এরাই হল সম্পত্তিবান শ্রেণী। এই মালিকানার সুবাদে তারাই সমাজের উপর কর্তৃত্ব কায়েম করে। অপরদিকে শোষিত শ্রেণী বলতে তাদেরই বোঝায় যারা উৎপাদন-উপাদানের মালিকানা থেকে বঞ্চিত। এরাই হল সম্পত্তিহীন শ্রেণী। জীবনধারণের জন্য এই শ্রেণী বিত্তবান শ্রেণীর কাছে তাদের শ্রম বিক্রয় করতে বাধ্য হয়। সুতরাং সামাজিক উৎপাদনে ব্যক্তিবর্গের অবস্থানের ভিত্তিতেই শোষকশ্রেণী ও শোষিত শ্রেণী নির্ধারিত হয়। ধনতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থায় উৎপাদন-উপাদানসমূহের উপর পুঁজিপতিদের একাধিপত্য বজায় থাকে। এই কারণে এই সমাজব্যবস্থায় সামাজিক উৎপাদন ও সংশ্লিষ্ট উৎপাদনের জন্য আবশ্যিক সামাজিক শ্রমকে পুঁজিপতি শ্রেণী সংগঠিত করে থাকে।