আচরণবাদের বৈশিষ্ট্য | আচরণবাদের বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে মতামত

রাষ্ট্রবিজ্ঞানের আলোচনায় আচরণবাদের বৈশিষ্ট্য

আচরণবাদের বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে মতামত: ইউলাউ আচরণবাদের চারটি বৈশিষ্ট্যের কথা বলেছেন। (১) আচরণবাদে ব্যক্তির আচরণকে তার কাঠামোর পরিপ্রেক্ষিতেই পর্যালোচনা করা হয়। (২) রাজনীতিক ভূমিকা ও রাজনীতিক লক্ষ্যের প্রতি এই মতবাদের দৃষ্টি নিবদ্ধ থাকে। এবং রাজনীতিক আচরণকে ব্যক্তির ব্যক্তিত্ব, সমাজ ও সামাজিক সংগঠনের প্রকাশ হিসাবে গণ্য করা হয়। (৩) আচরণবাদে কেবল ঘটনাকে নিয়েই আলোচনা করা হয় না। এই আলোচনা সচেতনভাবে তত্ত্বকেন্দ্রিক। (৪) এই মতবাদে রাষ্ট্রবিজ্ঞানের আলোচনায় একটি কঠোর গবেষণা পদ্ধতি গঠন করতে চায়। এই উদ্দেশ্যে পরীক্ষাযোগ্য নমুনার সমস্যা, অনুসিদ্ধান্ত, নির্ভরযোগ্য কার্যপদ্ধতি, কার্যকরী সংজ্ঞা, সত্যতা যাচাই করার মাপকাঠি প্রভৃতির কথা বলা হয়। কার্কপেট্রিক আচরণবাদের চারটি বৈশিষ্ট্যের কথা বলেছেন। ইস্টন আটটি বৈশিষ্ট্যের উল্লেখ করেছেন। এই বৈশিষ্ট্যগুলি হল: 

  • (ক) নিয়মানুবর্তিতা (regularities), 

  • (খ) সত্যাসত্য নির্ধারণ (verification), 

  • (গ) কৌশল সৃষ্টি (techniques), 

  • (ঘ) সংখ্যায়ন (quantification), 

  • (ঙ) মূল্যবোধ (values), 

  • (চ) সুসংহতকরণ (systematization), 

  • (ছ) বিশুদ্ধ বিজ্ঞান (pure science) ও 

  • (জ) সংহতি সাধন (integration)।

সামগ্রিক আলোচনার পরিপ্রেক্ষিতে আচরণবাদের কতকগুলি সাধারণ বৈশিষ্ট্যের উল্লেখ করা যেতে পারে।


(১) তত্ত্বকেন্দ্রিক: আচরণবাদ আত্মসচেতনভাবেই তত্ত্বকেন্দ্রিক। বলা হয় যে, তত্ত্বকে বাস্তবধর্মী গবেষণার দ্বারা যাচাই করতে হবে। তারপর সেই গবেষণালব্ধ তথ্য রাজনীতিক তত্ত্বকে সমৃদ্ধ করবে। আচরণবাদে তত্ত্ব ও গবেষণার পারস্পরিক নির্ভরশীলতার উপর গুরুত্ব আরোপ করা হয়। আচরণবাদে অভিজ্ঞতাবাদী তত্ত্ব ও গবেষণার মধ্যে সংহতি সাধনের চেষ্টা করা হয়। এ বিষয়ে ডেভিড ইস্টন তাঁর The Political System গ্রন্থে বিস্তারিতভাবে আলোচনা করেছেন। তাঁর মতানুসারে তত্ত্বের ভিত্তিতেই গুরুত্বপূর্ণ রাজনীতিক উপাদান নির্ধারণ করা যায় এবং তাদের পারস্পরিক সম্পর্ক অনুধাবন করা যায়। রাষ্ট্রবিজ্ঞানের বিজ্ঞানসম্মত অনুধাবন গবেষণার ব্যাপক তাত্ত্বিক ধারণার মাধ্যমেই সম্ভব হয়। নূতন ও পুরাতন গবেষণালব্ধ সিদ্ধান্তের বিশ্বাসযোগ্যতা তত্ত্বের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত হয়। তা ছাড়া গবেষণার ক্ষেত্রে তুলনামূলক বিচার-বিশ্লেষণের সম্ভাবনা ও সুযোগ সৃষ্টি করে তত্ত্ব।


(২) মূল্যায়ন নিরপেক্ষ: আচরণবাদে অভিজ্ঞতাপ্রসূত বিশ্লেষণ থেকে নৈতিক মূল্যায়নকে পৃথক করার কথা বলা হয়। ইস্টন বলেছেন: “Ethical evaluation and empirical explanation should be kept separate.” অর্থাৎ আচরণবাদ আলোচনাকে 'মূল্যমান-নিরপেক্ষ' (value free) করতে চায়। যে-কোন বৈজ্ঞানিক আলোচনার অন্যতম শর্ত হল মূল্যবোধ-নিরপেক্ষতা। ভৌত বিজ্ঞানীদের মত আচরণবাদীরাও রাষ্ট্রবিজ্ঞানের আলোচনা থেকে মূল্যবোধকে বাতিল করার পক্ষপাতী। আচরণবাদী আলোচনায় আদর্শ, নীতিবোধ, মূল্যবোধ প্রভৃতিকে স্বীকার করা হয় না। নৈতিকতা, ঔচিত্য-অনৌচিত্য প্রভৃতি আচরণবাদী আলোচনায় অস্বীকৃত।


(৩) তাত্ত্বিক ও অভিজ্ঞতাবাদী বিশ্লেষণ: আচরণবাদে ব্যক্তি বা সামাজিক গোষ্ঠীর আচরণের তাত্ত্বিক ও অভিজ্ঞতাবাদী বিশ্লেষণই মুখ্য লক্ষ্য বলে গণ্য হয়। এখানে ঘটনা, কাঠামো, প্রতিষ্ঠান বা আদর্শের আলোচনার উপর গুরুত্ব আরোপ করা হয় না। আচরণবাদের আলোচনা কেবলমাত্র তাত্ত্বিক বিশ্লেষণের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। আচরণবাদে রাজনীতিক বাস্তবতার পরিপ্রেক্ষিতে রাষ্ট্রবিজ্ঞানের ধারণা ও নীতিগুলিকে পরীক্ষা-নিরীক্ষার কথা বলা হয়। বলা হয় যে অভিজ্ঞতার দৃঢ় ভিত্তির উপর রাষ্ট্রবিজ্ঞানের ধারণা ও নীতিগুলিকে যাচাই করে দেখতে হবে এবং তার ফলাফলের ভিত্তিতে গ্রহণ বা বর্জন করতে হবে। আচরণবাদীদের মতানুসারে তত্ত্ব ও অভিজ্ঞতার সমন্বয়ে রাষ্ট্রবিজ্ঞানের রূপান্তর ঘটবে।


(৪) বিজ্ঞানসম্মত পদ্ধতি: আচরণবাদ রাজনীতিক আচরণ পর্যালোচনার ক্ষেত্রে কঠোরভাবে বিজ্ঞানসম্মত পদ্ধতি অবলম্বনের পক্ষে। বলা হয় যে, তথ্য সংগ্রহ, শ্রেণীবিন্যাস, বিচার-বিশ্লেষণ, যথার্থতা যাচাই, পরীক্ষাযোগ্য সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং তথ্যের পরিমাপ ও সংখ্যায়নের উপর গুরুত্ব আরোপ করতে হবে। রাষ্ট্রবিজ্ঞানকে বিশুদ্ধ বিজ্ঞানের স্তরে উন্নীত করতে আচরণবাদীরা বিশেষভাবে আগ্রহী। এই কারণে তাঁরা সুসমৃদ্ধ গবেষণায় বিশ্বাসী। রাষ্ট্রবিজ্ঞানের আলোচনায় তাঁরা বিশুদ্ধ বিজ্ঞানের দৃষ্টিভঙ্গি প্রয়োগের পক্ষপাতী। ভৌত বিজ্ঞানের মত রাষ্ট্রবিজ্ঞানের আলোচনায় আচরণবাদীরা বিশুদ্ধ বিজ্ঞানের পন্থা-পদ্ধতি ও সংহতি সাধনের উপর জোর দেন। পরিমাপ, সংখ্যায়ন, ধারণার সুসংবদ্ধকরণ, সত্যাসত্য নির্ধারণ, নিয়মমাফিকতা (regularities) প্রভৃতির উপর জোর দেওয়া হয়। ধারণা, অনুমান ও মূলনীতিগুলিকে কঠোরভাবে নিয়মানুবর্তী পদ্ধতির মাধ্যমে পরীক্ষা-নিরীক্ষার কথা বলা হয়। অর্থাৎ আচরণবাদীরা রাষ্ট্রবিজ্ঞানের আলোচনায় ভৌত বিজ্ঞানের কতকগুলি কলা-কৌশলের উপর গুরুত্ব আরোপ করেছেন।


(৫) সমাজতত্ত্ব সামাজিক মনোবিদ্যা ও সাংস্কৃতিক নৃতত্ত্বের সঙ্গে সম্পর্ক: আচরণবাদ রাজনীতিক তত্ত্ব ও গবেষণাকে সামাজিক মনোবিদ্যা, সমাজতত্ত্ব ও সাংস্কৃতিক নৃতত্ত্বের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে সংযুক্ত করার পক্ষপাতী। আচরণবাদ অনুসারে রাজনীতিক আচরণ ব্যক্তিত্ব, সামাজিক সংগঠন ও সমাজের প্রকাশ ছাড়া কিছু নয়।


(৬) আন্তঃ সামাজিক বিজ্ঞান সহযোগিতা: আচরণবাদীদের মতানুসারে সামাজিক বিজ্ঞানের বিভিন্ন শাখার মধ্যে সংযোগ সাধন ব্যতিরেকে ব্যক্তির ভূমিকাকে সঠিকভাবে পর্যালোচনা করা যায় না। তাই আচরণবাদে বিজ্ঞানসমূহের মধ্যে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক স্থাপনের উপর জোর দেওয়া হয়। অর্থাৎ আচরণবাদী দৃষ্টিভঙ্গি হল আন্তঃ-সামাজিক বিজ্ঞানমুখী। অন্যান্য সামাজিক বিজ্ঞানের সঙ্গে রাষ্ট্রবিজ্ঞানের সংহতি সাধনের ব্যাপারে আচরণবাদীরা আগ্রহী। তাঁদের মতানুসারে ব্যক্তির রাজনীতিক আচরণ সমগ্র সামাজিক জীবনধারার একটি অংশমাত্র। ব্যক্তির রাজনীতিক আচরণ তার সামগ্রিক আচরণেরই বিশেষ একটি অংশমাত্র। তাই ব্যক্তির রাজনীতিক আচরণ সম্পর্কে যথাযথভাবে ওয়াকিবহাল হওয়ার জন্য সমগ্র সমাজব্যবস্থার প্রকৃতি বা সমগ্র জীবনধারা সম্পর্কে অবহিত হওয়া দরকার। তাই ব্যক্তিকে সামগ্রিকভাবে অনুধাবন করা কোন বিশেষ একটি সামাজিক বিজ্ঞানের পক্ষে সম্ভব হয় না। এই কারণে আচরণবাদীরা সকল সামাজিক বিজ্ঞানের মধ্যে আন্তঃ-সম্পর্ক বা আন্তঃ-সহযোগিতার উপর জোর দেন। ডেভিড ইস্টন তাঁর The Political System গ্রন্থে এই অভিমত ব্যক্ত করেছেন যে অন্যান্য সামাজিক বিজ্ঞানের কাছ থেকে রাষ্ট্রবিজ্ঞান শিক্ষা নিতে পারে।


(৭) রাজনীতিক কাজের আলোচনা: আচরণবাদীরা ক্ষমতা প্রয়োগ সম্পর্কিত যে-কোন কাজকে রাজনীতিক কাজ বলে গণ্য করেন। এবং এই রকম যে-কোন কাজকে তাঁরা রাষ্ট্রবিজ্ঞানের আলোচ্য বিষয়ের অন্তর্ভুক্ত করতে চান। তাঁরা প্রতিষ্ঠানকেন্দ্রিক আলোচনার বিরোধী। আচরণবাদে মানুষের রাজনীতিক আচরণকে রাষ্ট্রবিজ্ঞানের বিষয়বস্তু করলেও প্রতিষ্ঠানের আলোচনাকে একেবারে বাদ দিয়ে দেওয়া হয়নি। প্রতিষ্ঠানের প্রয়োজনীয়তার কথাও স্বীকার করা হয়েছে। প্রতিষ্ঠানের বাস্তবতাকে আচরণবাদীরা অস্বীকার করেন না। কিন্তু, ইউলাউ-এর মতানুসারে, কোন প্রতিষ্ঠানের রাজনীতিক উপাদানগুলি এককভাবে বিভিন্ন রাজনীতিক আচরণকে ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ করতে পারে না।


(৮) ব্যক্তি ও গোষ্ঠীর আচরণ ব্যাখ্যা: আচরণবাদী রাষ্ট্রবিজ্ঞানিগণ মনে করেন যে, রাজনীতিক আচরণগত সমস্যাদির বিচার-বিশ্লেষণ ব্যতিরেকে রাষ্ট্রবিজ্ঞানের গবেষণা সম্পূর্ণ হতে পারে না। তাই তাঁরা মূলত ব্যক্তি ও গোষ্ঠীর আচরণ ব্যাখ্যার মাধ্যমে রাষ্ট্রবিজ্ঞানকে পরিপূর্ণতা দিতে চান। আচরণবাদী দৃষ্টিভঙ্গিতে কেন্দ্রীয় গুরুত্বপূর্ণ তথ্য হল ব্যক্তির রাজনীতিক আচরণ। তবে অনুসন্ধানের তাত্ত্বিক লক্ষ্য হিসাবে আচরণবাদীদের গবেষণা কেবলমাত্র ব্যক্তির ক্ষেত্রেই সীমাবদ্ধ নয়। ব্যক্তির আচরণের উপর রাজনীতিক আচরণবাদীরা গুরুত্ব আরোপ করেন এই কারণে যে যৌথ আচরণ গড়ে উঠে ব্যক্তিবর্গের মিথষ্ক্রিয়া ও পারস্পরিক আদান-প্রদানের সমন্বয়ে। ইউলাউ-এর মতানুসারে বিভিন্ন ব্যক্তির মধ্যে মিথষ্ক্রিয়া (interaction) যৌথ আচরণের সৃষ্টি করে। সেই আচরণই আচরণবাদের আলোচনার বিষয়বস্তু হিসাবে বিবেচিত হয়।


(৯) রাষ্ট্রকেন্দ্রিক আলোচনার বিরোধী: আচরণবাদীরা রাষ্ট্রকেন্দ্রিক আলোচনার বিরোধী। তাঁরা সকল রকম রাজনীতিক আচরণ এবং রাজনীতিক কার্যকলাপ বিচার-বিশ্লেষণ করতে চান। কিন্তু রাষ্ট্রকেন্দ্রিক আলোচনার মাধ্যমে তা সম্ভব হয় না। তাই আচরণবাদে রাষ্ট্রকে গুরুত্ব দেওয়া হয় না। সমাজের যাবতীয় ক্রিয়াকর্মের কেন্দ্রীয় চরিত্র হিসাবে ব্যক্তির কথা বলা হয়।


(১০) বহু দৃষ্টিভঙ্গির সমষ্টিবদ্ধ রূপ: প্রকৃত প্রস্তাবে আচরণবাদ হল বহু দৃষ্টিভঙ্গির একটি সমষ্টিবদ্ধ রূপ। কোন বিশেষ একটি দৃষ্টিভঙ্গিকে কেন্দ্র করে আচরণবাদী দৃষ্টিভঙ্গি গড়ে উঠেনি। ইউলাউ-এর অভিমত অনুসারে কোন একটি মাত্র দৃষ্টিভঙ্গি নয়, আচরণবাদের মধ্যে একাধিক দৃষ্টিভঙ্গি বর্তমান। সকল আচরণবাদী রাষ্ট্রবিজ্ঞানী একই রকম দৃষ্টিভঙ্গি অনুসরণ করেননি। বিভিন্ন আচরণবাদীর আলোচনায় বাস্তব ঘটনার প্রতি দৃষ্টিভঙ্গি, অনুসৃত অনুধাবন পদ্ধতি, কৌশল, সমস্যাদি প্রভৃতি ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য পার্থক্য দেখা যায়।


(১১) একটি বিপ্লব: আসলে আচরণবাদ হল একটি বিপ্লব। দুটি দিক থেকে আচরণবাদকে একটি বিপ্লব হিসাবে অভিহিত করা যায়। প্রথমত, আচরণবাদে ব্যক্তির রাজনীতিক আচরণকে রাষ্ট্রবিজ্ঞানের মুখ্য আলোচ্য বিষয়ে পরিণত করা হয়েছে। এবং দ্বিতীয়ত, রাজনীতিক আচরণ বিশ্লেষণের ক্ষেত্রে বিজ্ঞানসম্মত বিভিন্ন কৌশল ও উপায়-পদ্ধতি প্রয়োগ করা হয়েছে। ডেভিড ইস্টনের মতানুসারে আচরণবাদ রাষ্ট্রবিজ্ঞানের আলোচনায় আমূল পরিবর্তন সূচীত করেছে।