গণপরিষদ কাকে বলে? গণপরিষদের গঠন ও উদ্দেশ্য আলোচনা করাে। ভারতের সংবিধান প্রণয়নে গণপরিষদের ভূমিকা আলােচনা করাে।

গণপরিষদ


গণতান্ত্রিক দেশের সংবিধান জনগণের দ্বারা রচিত ও গৃহীত হয়। জনগণের পক্ষ থেকে সংবিধান রচনার গুরুদায়িত্ব যে সাংবিধানিক কমিটির মাধ্যমে সম্পাদিত হয় তাকে গণপরিষদ বলে। গণপরিষদের সভাপতি ছিলেন ড. রাজেন্দ্র প্রসাদ। ১৯৪৯ সালের ২৬ নভেম্বর গণপরিষদে ভারতীয় সংবিধান গৃহীত হয়েছিল। ভারতীয় গণপরিষদের প্রথম অধিবেশন ১৯৪৬-এর ৯ ডিসেম্বর থেকে ২৩ ডিসেম্বর পর্যন্ত দিল্লিতে অনুষ্ঠিত হয়।


গণপরিষদের গঠন


১৯৪৬ সালের ক্যাবিনেট মিশন পরিকল্পনা অনুসারে চারটি মূলনীতির ভিত্তিতে ভারতীয় গণপরিষদ গঠনের ব্যবস্থা গৃহীত হয়। সেই নীতিগুলি হল一


  • [1] ব্রিটিশশাসিত প্রদেশ ও দেশীয় রাজ্যগুলির জনসংখ্যার অনুপাতে গণপরিষদে প্রতিনিধিত্বের ব্যবস্থা করা।


  • [2]গণপরিষদের সমস্ত আসন সাধারণ (মুসলমান ও শিখ ছাড়া অন্য সব সম্প্রদায়), মুসলমান ও শিখ—এই তিন সম্প্রদায়ের মধ্যে আনুপাতিক হারে বণ্টন করা।


  • [3] প্রাদেশিক আইনসভাগুলিতে প্রত্যেক সম্প্রদায়ের সদস্যদের একক হস্তান্তরযােগ্য সমানুপাতিক ভােটাধিকারের ভিত্তিতে নিজ নিজ সম্প্রদায়ের প্রতিনিধি নির্বাচনের ব্যবস্থা করা।


  • [4] দেশীয় রাজ্যগুলির লােকসংখ্যার অনুপাত অনুযায়ী গণপরিষদে প্রতিনিধিত্বের ব্যবস্থা করা।


ক্যাবিনেট মিশনের প্রস্তাব অনুযায়ী গণপরিষদের মােট সদস্যসংখ্যা ৩৮৯ স্থির করা হয়। ব্রিটিশ-শাসিত প্রদেশগুলি থেকে ২৯২ জন সদস্য গ্রহণের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। এর মধ্যে মুসলমানদের জন্য ৭৮টি, শিখদের জন্য ৪টি এবং সাধারণের অর্থাৎ মুসলমান ও শিখ ছাড়া অন্য সব সম্প্রদায়ের জন্য ২১০টি আসন নির্দিষ্ট করা হয়। এ ছাড়া অনধিক ৯৩ জন সদস্য দেশীয় রাজ্যগুলি থেকে এবং ৪জন সদস্য চিফ কমিশনার শাসিত প্রদেশগুলি থেকে নেওয়া হবে বলে স্থির করা হয়। ক্যাবিনেট মিশনের প্রস্তাব অনুযায়ী ১৯৪৬ সালের জুলাই মাসে গণপরিষদ গঠনের জন্য নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। চিফ কমিশনার-শাসিত প্রদেশগুলির চারটি আসন সমেত ব্রিটিশ ভারত থেকে মােট ২৯৬ জন প্রতিনিধির জন্য গণপরিষদের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। দলগত বিচারে গণপরিষদ নির্বাচনে কংগ্রেস ৬৯ শতাংশ আসন লাভের মাধ্যমে নিরঙ্কুশ প্রাধান্য প্রতিষ্ঠা করে। উপরন্তু, ভারত বিভাগের সিদ্ধান্ত গৃহীত হওয়ার পর মুসলিম লিগের প্রতিনিধিরা ভারতীয় গণপরিষদ থেকে পদত্যাগ করলে কার্যত পরিষদে কংগ্রেসের প্রাধান্য বহুগুণ বৃদ্ধি পায়।


গণপরিষদের উদ্দেশ্য


গণপরিষদের প্রধান উদ্দেশ্য ছিল এমন একটি খসড়া সংবিধান রচনা করা, যা সামাজিক বিপ্লবের চরম লক্ষ্য অর্জন করতে পারবে। পণ্ডিত নেহরুর অভিমত ছিল, গণপরিষদের প্রধান কাজ হবে একটি নতুন সংবিধানের মাধ্যমে স্বাধীন ভারতবর্ষের ক্ষুধার্ত ও বস্ত্রহীন মানুষের জন্য অন্নবস্ত্রের সংস্থান করা এবং যােগ্যতা অনুযায়ী প্রতিটি ভারতবাসীর আত্মবিকাশের জন্য সর্বাধিক সুযােগের ব্যবস্থা করা। সভাপতি ড. রাজেন্দ্র প্রসাদ ঘােষণা করেন, গণপরিষদের লক্ষ্য হবে দেশের সাধারণ নাগরিকদের দুঃখদারিদ্রের পরিসমাপ্তি ঘটানাে, বৈষম্য ও শােষণের অবসান ঘটানাে এবং সুন্দর জীবনযাত্রার উপযােগী পরিবেশ সৃষ্টি করা।


ভারতের সংবিধান প্রণয়নে গণপরিষদের ভূমিকা


প্রথম অধিবেশন: ১৯৪৬ সালের ৯ থেকে ২৩ ডিসেম্বর গণপরিষদের প্রথম অধিবেশন বসে। মুসলিম লিগের সদস্যরা এই অধিবেশনে যােগ দেননি। এই অধিবেশনে ড. রাজেন্দ্র প্রসাদ গণপরিষদের প্রথম স্থায়ী সভাপতি নির্বাচিত হন। এই অধিবেশনে জওহরলাল নেহরু ভারতবর্ষকে স্বাধীন সার্বভৌম সাধারণতন্ত্র হিসেবে উল্লেখ করে একটি প্রস্তাব উত্থাপন করেন।


দ্বিতীয় অধিবেশন: গণপরিষদের দ্বিতীয় অধিবেশন ১৯৪৭ সালের ২১ জানুয়ারি শুরু হয় এবং ২৬ জানুয়ারি পর্যন্ত তা স্থায়ী হয়। এই অধিবেশনে গণপরিষদের সহসভাপতি হিসেবে হরেন্দ্রকুমার মুখােপাধ্যায়কে নির্বাচন করা হয়।


তৃতীয় অধিবেশন: গণপরিষদের তৃতীয় অধিবেশন ১৯৪৭ সালের ২২ এপ্রিল থেকে ২ মে পর্যন্ত অনুষ্ঠিত হয়। এই অধিবেশনে যে কটি কমিটি গঠিত হয়, তার মধ্যে দুটি গুরুত্বপূর্ণ কমিটি হল—

  • (i) কেন্দ্রীয় সংবিধান সম্পর্কিত কমিটি এবং 

  • (ii) প্রাদেশিক সংবিধান সম্পর্কিত কমিটি।


চতুর্থ অধিবেশন: ১৯৪৭ সালের ১৪ থেকে ৩১ জুলাই পর্যন্ত গণপরিষদের চতুর্থ অধিবেশন অনুষ্ঠিত হয়। এই অধিবেশনে নতুন ভারতের জাতীয় পতাকা সম্পর্কে সিদ্ধান্ত গ্রহণের জন্য একটি অস্থায়ী কমিটি নিয়ােগের সিদ্ধান্ত হয়।


ইতিমধ্যে লর্ড মাউন্টব্যাটেন ভাইসরয় পদে যােগ দেওয়ার পর ভারত বিভাগ ও ক্ষমতা হস্তান্তর সম্পূর্ণ হয়। ১৯৪৭ সালের ১৪ আগস্ট মধ্যরাতে গণপরিষদের একটি বিশেষ অধিবেশন বসে।


পঞ্চম অধিবেশন: পঞ্চম অধিবেশনের সময় থেকে ভারতীয় গণপরিষদ স্বাধীনতা আইন অনুযায়ী সার্বভৌম ক্ষমতাসম্পন্ন পরিষদের মর্যাদা অর্জন করে। পঞ্চম অধিবেশন থেকে গণপরিষদ সংবিধান রচনা ছাড়াও দেশের আইনসভা হিসেবে এক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। পঞ্চম অধিবেশন ১৯৪৭ সালের ১৪ থেকে ২৯ আগস্ট পর্যন্ত স্থায়ী হয়। এই অধিবেশনের শুরুতে মাউন্টব্যাটেনকে স্বাধীন ভারতের প্রথম গভর্নর জেনারেল এবং পণ্ডিত জওহরলাল নেহরুকে ভারতের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নিয়ােগ করা হয়। এ ছাড়া কেন্দ্রীয় আইনসভা হিসেবে গণপরিষদের প্রথম অধ্যক্ষ নির্বাচিত হন জি ভি মভলঙ্কর। একটি খসড়া সংবিধান প্রণয়নের জন্য এই অধিবেশনে খসড়া কমিটি গঠন করা হয়। ড. বি আর আম্বেদকর এই কমিটির সভাপতি নির্বাচিত হন। কমিটির অন্যান্য সদস্য ছিলেন আল্লাদি কৃষ্নস্বমী আয়ার, এন গােপালস্বামী আয়েঙ্গার, কে এম মুন্সি, সৈয়দ মহম্মদ শাহেদুল্লাহ, বি এল মিত্র, এবং ডি পি খৈতান। পরে ডি পি খৈতান ও বি এল মিত্র-র জায়গায় টি টি কৃষ্ণ ব্রহ্মচারী ও এন মাধবরাও নির্বাচিত হন।


খসড়া কমিটি: খসড়া কমিটি ১৯৪৭ সালের ৪ নভেম্বর খসড়া সংবিধান রচনার কাজ আরম্ভ করে। পরিশেষে ১৯৪৯ সালের ২৬ নভেম্বর গণপরিষদে ভারতের সংবিধান গৃহীত হয়। ১৯৫০ সালের ২৪ জানুয়ারি গণপরিষদের সর্বশেষ অধিবেশন অনুষ্ঠিত হয় এবং ১৯৫০ সালের ২৬ জানুয়ারি স্বাধীন ভারতের সংবিধান কার্যকরী হয়।


সুপরিবর্তনীয় সংবিধান বলতে কী বােঝ? সুপরিবর্তনীয় সংবিধানের সুবিধা ও অসুবিধাগুলি আলােচনা করাে।


দুষ্পরিবর্তনীয় সংবিধানের সুবিধা ও অসুবিধাগুলি | দুষ্পরিবর্তনীয় সংবিধানের গুণাগুণ | দুম্পরিবর্তনীয় সংবিধান কাকে বলে? 


সুপরিবর্তনীয় ও দুষ্পরিবর্তনীয় সংবিধানের মধ্যে পার্থক্য নির্দেশ করাে।


ভারতের সংবিধান প্রণয়নের সংক্ষিপ্ত রূপরেখা বিশ্লেষণ করে।


ভারতীয় সংবিধানের দর্শন যেভাবে প্রস্তাবনায় প্রতিফলিত হয়েছে তা আলােচনা করাে।


ভারতীয় সংবিধানের মুখবন্ধ বা প্রস্তাবনার গুরুত্ব ও তাৎপর্য বিশ্লেষণ করাে।


ভারতীয় সংবিধানের অপরিহার্য বৈশিষ্ট্যগুলি আলােচনা করাে | ভারতীয় সংবিধানের প্রধান বৈশিষ্ট্যগুলি লেখাে।