আমলাতন্ত্রের শ্রেণিবিভাগ করাে।

ভূমিকা: বিভিন্ন সময়ে রাষ্ট্রবিজ্ঞানীরা ভিন্ন ভিন্নভাবে আমলাতন্ত্রের সংজ্ঞা দিয়েছেন। অধ্যাপক গার্নারের মতে, যে শাসন ব্যবস্থায় মন্ত্রীদের দপ্তরগুলির দ্বারা শাসন পরিচালিত হয় এবং ওইসব দপ্তরের প্রশাসকদের দ্বারা নীতি নির্ধারিত হয়, তাকে আমলাতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থা বলা হয়।


আধুনিক শাসন ব্যবস্থায় সরকারের রাজনৈতিক অংশ বা স্থায়ী, অভিজ্ঞ, বেতনভুক কর্মচারীবৃন্দ অর্থাৎ আমলাদের দ্বারা পরিচালিত শাসনব্যবস্থা আমলাতন্ত্র নামে পরিচিত। এককথায় বলা যায়, সরকারি কর্মচারীদের নিয়ে গড়ে ওঠা একটি সংগঠন বা গােষ্ঠীবিশেষ হল আমলাতন্ত্র। অধ্যাপক জ্ঞানেন্দ্রমােহনের ভাষায় প্রভাবশালী যথেচ্ছাচার রাজকর্মচারীমণ্ডলীকে বলা হয় আমলাতন্ত্র। অধ্যাপক ফাইনার আমলাতন্ত্র-এর সংজ্ঞা দিয়েছেন এভাবে জন পালনকৃত্যক হল স্থায়ী বেতনভােগী এবং দক্ষ আমলাদের পেশাদারী প্রতিষ্ঠান (The civil service is a professional body of officials, permanent, paid and skilled.")


অধ্যাপক গার্নারের মতে, যে শাসন ব্যবস্থায় মন্ত্রীদের দপ্তরগুলির দ্বারা শাসন পরিচালিত হয় এবং ওই দপ্তরের প্রশাসকদের দ্বারা নীতি নির্ধারিত হয়, সেই শাসনব্যবস্থাকে আমলাতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা বলে অভিহিত করা হয়।


আমলাতন্ত্রের শ্রেণিবিভাগ


মার্লি ফেনসড আমলাতন্ত্রের পাঁচ ধরনের শ্রেণিবিভাগের উল্লেখ করেছেন। সেগুলি হল যথাক্রমে―

  • (১) প্রতিনিধিত্বমূলক আমলাতন্ত্র,
  • (২) একদলীয় রাষ্ট্র ব্যবস্থার আমলাতন্ত্র,
  • (৩) সামরিক শাসন ব্যবস্থার আমলাতন্ত্র,
  • (৪) এক ব্যক্তির শাসনের আমলাতন্ত্র এবং
  • (৫) আমলা-শাসিত আমলাতন্ত্র।


(১) প্রতিনিধিত্বমূলক আমলাতন্ত্র: যেসকল রাজনৈতিক ব্যবস্থায় কর্তৃত্ব (Power) প্রতিযােগিতামূলক দলীয় রাজনৈতিক ব্যবস্থা দ্বারা নির্ধারিত হয়, তাকে প্রতিনিধিত্বমূলক আমলাতন্ত্র বলা হয়। প্রতিনিধিত্বমূলক আমলাতন্ত্র দলীয় ব্যবস্থার দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয়ে থাকে। এই ধরনের আমলাতন্ত্রের রাজনৈতিক ব্যবস্থার মূলনীতি সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ করা প্রয়ােজন। এক্ষেত্রে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর গড়ে ওঠা ফ্রান্সের আমলাতন্ত্রের কথা উদাহরণ হিসেবে বলা যেতে পারে।


(২) একদলীয় রাষ্ট্রব্যবস্থার আমলাত: প্রধানত সামগ্রিকতাবাদী রাজনৈতিক ব্যবস্থার আমলাতন্ত্রকে একদলীয় আমলাতন্ত্র বলা হয়। এই ব্যবস্থায় একটি দলের কলাকৌশল রূপায়ণের দায়িত্ব আমলাবাহিনীর উপর চাপিয়ে দেওয়া হয়। অ্যালমন্ড এবং পাওয়েল বলেন যে, ভারতে একদলীয় রাষ্ট্র না থাকা সত্ত্বেও একসময় কংগ্রেস দল আধিপত্য বিস্তার করেছিল, যার ফলে একদলীয় রাষ্ট্রব্যবস্থার আমলাতন্ত্রের প্রবণতা দেখা গিয়েছিল।


(৩) সামরিক শাসন ব্যবস্থায় আমলাতন্ত্র: সামরিক বাহিনী দ্বারা পরিচালিত শাসন ব্যবস্থায় সামরিক বাহিনীর একটা অংশ আমলাতন্ত্রের অংশ হিসেবে যে ধরনের কাজ করে, তাকে সামরিক শাসনব্যবস্থার আমলাতন্ত্র বলা হয়। সামরিক বাহিনীর প্রশিক্ষণ ও মতামত অনুসারে এই ধরনের আমলাতন্ত্র পরিচালিত হয়। যেমন চিলি ও ইন্দোনেশিয়ার আমলাতন্ত্র।


(৪) এক ব্যক্তির শাসনের আমলাতন্ত্র: এই ধরনের আমলাতন্ত্র শাসকের নিজের ইচ্ছা প্রশাসনের উপর চাপিয়ে দেওয়া হয়। একনায়ক হিটলার ও মুসােলিনির আমলের আমলাতন্ত্রের কথা উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরা যায়। এই আমলাতন্ত্রের আমলা প্রধান শাসকের নির্দেশ মেনে চলেন।


(৫) আমলা-শাসিত আমলাতন্ত্র: এই প্রকার আমলাতন্ত্রের আমলাগণই শাসনব্যবস্থার প্রধান উপাদান বা অঙ্গ হিসেবে বিবেচিত হয়। অধিবাসীদের উপর কমবেশি পূর্ণ কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে আমলাবাহিনী দায়িত্ব সম্পন্ন করে। সাধারণত ঔপনিবেশিক আমলের শাসনব্যবস্থার মধ্যে এই ধরনের আমলাতন্ত্রের অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া যায়। আধুনিক রাষ্ট্রবিজ্ঞানীরা ও সমাজবিজ্ঞানীরা বিভিন্নভাবে আমলাতন্ত্রের শ্রেণিবিভাগ করেছেন।


মরস্টেইন মার্কস-এর শ্রেণিবিভাগ: ইতিহাসে যে বিভিন্ন ধরনের আমলাতন্ত্র দেখা যায়, তার ভিত্তিতে মরস্টেইন মার্কস আমলাতন্ত্রকে চার শ্রেণিতে ভাগ করেছেন

  • অভিভাবক আমলাতন্ত্র : এই ধরনের আমলাতন্ত্র দেখা দিত প্রাচীন চীন এবং রাশিয়া।
  • জাতভিত্তিক আমলাতন্ত্র : এই ধরনের আমলাতন্ত্রের আমার একটি শ্রেণি থেকেই নিযুক্ত হতেন।
  • পৃষ্ঠপােষিত আমলাতন্ত্র : এই ধরনের আমলাতন্ত্র উনবিংশ শতাব্দীর ইংল্যান্ডে ছিল।
  • মেধাভিত্তিক আমলাতন্ত্র : আধুনিক পশ্চিমি সমাজে এই ধরনের আমলাতন্ত্র দেখা যায়।

প্রধানত মধ্যবিত্ত আমলাদের নিয়ে গঠিত। এই চার শ্রেণির আমলাতন্ত্রকে ঘিরে আরও আমলাতন্ত্রের শ্রেণি রয়েছে। যেমন শাসক আমলাতন্ত্র বা সামরিক আমলাতন্ত্র।


আইজেনস্ট্যাট-এর শ্রেণিবিভাগ: আধুনিক সমাজতাত্ত্বিক আইজেনস্ট্যাট শাসকশ্রেণির সঙ্গে সম্পর্কের ভিত্তিতে আমলাতন্ত্রকে চারটি শ্রেণিতে ভাগ করেছেন

  • (১) শাসকশ্রেণি বা প্রধান সামাজিক গোষ্ঠীর সেবায় নিয়ােজিত আমলাতন্ত্র।
  • (২) শাসকদের অনুগত আমলাতন্ত্র।
  • (৩) আত্মসেবায় নিয়ােজিত স্বাতন্ত্র্যসম্পন্ন আমলাতন্ত্র।
  • (৪) কোনাে নির্দিষ্ট শ্রেণির সেবায় নয়, সামগ্রিকভাবে রাজনৈতিক ব্যবস্থার সেবায় এবং আত্মার কল্যাণে নিয়ােজিত আমলাতন্ত্র।

আধুনিক রাষ্ট্রে আমলাতান্ত্রিক সরকারি সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে রাষ্ট্রের কল্যাণমূলক কাজ রূপায়ণে আমলারা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। বিশেষত উন্নয়নশীল দেশগুলিতে আমলাতন্ত্রের ভূমিকা অতিমাত্রায় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।


নামসর্বস্ব শাসক আর প্রকৃত শাসকের মধ্যে পার্থক্য । আধুনিক রাষ্ট্রের শাসন বিভাগের ক্ষমতা বৃদ্ধির কারণ


রাষ্ট্রের শাসন বিভাগের মূল কাজ । আধুনিক রাষ্ট্রের শাসন বিভাগের কার্যাবলি


আমলাতন্ত্র বলতে কী বােঝায়? আমলাতন্ত্রের বা শাসন বিভাগের অরাজনৈতিক বা স্থায়ী অংশের বৈশিষ্ট্যগুলি আলােচনা করাে।